রাজপরিবার মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ঐশ্বর্য, আভিজাত্য আর জাঁকজমক। কিন্তু ইতিহাসের এই সোনালী পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে অনেক দীর্ঘশ্বাস আর না-বলা বেদনা। তেমনই এক মর্মস্পর্শী কাহিনী আজও সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের নাটমন্দিরে। নাটমন্দিরের দেওয়ালে শ্বেতপাথরের ফলকে খোদাই করা রয়েছে এক অভিমানী মহারানীর জীবনের শেষ বিদায়লিপি, যা লিখে তিনি চিরতরে ছেড়ে গিয়েছিলেন বর্ধমান।
বর্ধমানের রাজপরিবারের ঐতিহ্য আর সর্বমঙ্গলা মন্দিরের মাহাত্ম্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু এই মন্দিরের নাটমন্দিরে গেলে আজও চোখে পড়ে দেওয়ালে ফলকের উপর লেখা এক মহিলার হৃদয়বিদারক কাহিনী। সেখানে মায়ের কাছে এক অসহায়া তনয়ার হৃদয়ের দুঃখের কথা লেখা রয়েছে। এই চরম অভিমানী চিঠিটি লিখে মহারানী রাধারানী চিরতরে ত্যাগ করেন বর্ধমান।
ইতিহাসবিদদের মতে, মহারাজাধিরাজ বিজয় চাঁদ মহাতাবের স্ত্রী ছিলেন রাধারানী মহাতাব। মাত্র ছয় বছর বয়সে বর্ধমানে এসেছিলেন তিনি এবং ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র নয় বছর বয়সে বিজয় চাঁদ মহাতাবের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহের কয়েক বছর পর, ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ ভ্রমণে গিয়েছিলেন বিজয় চাঁদ মহাতাব। সেখান থেকে ফেরার সময় তিনি তাঁর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে শিলা পিট নামের এক ব্রিটিশ মহিলাকে বর্ধমানে নিয়ে আসেন। রাজবাড়ির অন্দরমহলে এই বিদেশি মহিলার প্রবেশ ও তাঁর উপস্থিতি একেবারেই ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি মহারানী রাধারানী। এই মেমসাহেবকে কেন্দ্র করে মহারাজ ও মহারানীর দাম্পত্য জীবনে তীব্র পারিবারিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
দ্বন্দ্বের জেরে কয়েক বছর পর বর্ধমান ছেড়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান শিলা পিট। কিন্তু স্ত্রীর ওপর অভিমান করে নিজের পুত্রদের নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যান মহারাজাও। একদিকে শিলা পিটের আগমন এবং অন্যদিকে মহারাজের এই দূরত্ব—সব মিলিয়ে মহারানী অত্যন্ত ম্লান ও অভিমানী হয়ে পড়েন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন রাজপ্রাসাদের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে কাশীবাসী হওয়ার। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান ত্যাগের আগে তিনি তাঁর মনের গভীর দুঃখের কথা সর্বমঙ্গলা মন্দিরের নাটমন্দিরের একটি বড় শ্বেতপাথরের ওপর খোদাই করে রেখে যান।
পরবর্তীকালে বর্ধমান ফিরে মহারাজা যখন এই খোদাই করা বিদায়লিপি দেখেন, তখন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে রাজত্ব চালানোর পাশাপাশি তিনি ধর্মীয় জীবন পালনে জোর দেন এবং ১৯৪১ সালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অন্যদিকে, মহারানী রাধারানী মহাতাব আর কোনোদিন বর্ধমানে ফিরে আসেননি। ১৯৭২ সালে কাশীতেই তাঁর মৃত্যু হয়। কাশীতে তিনি যে আশ্রমে থাকতেন, তা আজও বর্তমান। সময়ের স্রোতে রাজকীয় জাঁকজমক আজ ম্লান হয়েছে, কিন্তু সর্বমঙ্গলা মন্দিরের সেই শ্বেতপাথরের ফলকটি আজও মহারানীর নীরব কান্নার সাক্ষী হয়ে অমলিন রয়ে গেছে।





