বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৈতৃক ভিটে, বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের কাছারিবাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল ভারতের নন, বাংলাদেশেরও গর্ব। তাঁর সাহিত্য, সঙ্গীত ও সমাজভাবনা দুই বাংলার সংস্কৃতিতে গভীরভাবে মিশে আছে। এমন ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানে ভাঙচুরের ঘটনায় সচেতন মহল সর্বত্র ধিক্কার জানাচ্ছে। অনেকেই এই ঘটনাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূস-এর বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতি ঔদাসীন্যের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
পার্কিং ফি নিয়ে বিবাদ, তারপর সহিংসতা
ঘটনার সূত্রপাত গত ৮ জুন। সেদিন একটি পর্যটক পরিবার শাহজাদপুরের কাছারিবাড়ি পরিদর্শনে যান। সেখানে পার্কিং ফি নিয়ে গেটের কর্মীদের সঙ্গে তাদের বচসা শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে, ওই পরিবারকে একটি ঘরে আটকে রেখে মারধর করা হয়। এই ঘটনার জেরে স্থানীয়রা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। এরপর উত্তেজিত জনতা কাছারিবাড়ির অডিটোরিয়ামে হামলা চালায় এবং ব্যাপক ভাঙচুর করে।
তদন্ত কমিটি গঠন, দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ
এই ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং পাঁচ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলেছে। বর্তমানে কাছারিবাড়ি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। কাছারিবাড়ির তত্ত্বাবধায়ক মহম্মদ হাবিবুর রহমান জানান, “অনিবার্য কারণবশত কাছারিবাড়িতে প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।”
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সাংস্কৃতিক অবমাননা: নতুন বিতর্কের জন্ম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুরের এই কাছারিবাড়িতে বসেই তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘চোখের বালি’, ‘চতুরঙ্গ’, ‘ঘরে বাইরে’-এর মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম রচনা করেছিলেন। তাঁর কবিতা ও চিঠিপত্রে শাহজাদপুরের জীবনের গভীর ছোঁয়া পাওয়া যায়। এমন একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থানে এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এই ঘটনায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, রবীন্দ্রনাথ যদি ইসলাম ধর্মাবলম্বী হতেন, তবে কি এমন ঘটনা ঘটত? এটি কি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য বা উদ্দেশ্য রয়েছে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের কবি নন; তিনি বাংলা ভাষার কবি, বাঙালির কবি। তিনি ভারত তথা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক এবং একইসঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। তাঁর প্রতি এমন অবমাননা ও অশ্রদ্ধা আসলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর একটি চরম আঘাত। এই ঘটনা ইউনূসের নতুন বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেও অনেকে মনে করছেন।