“মৃতদের শনাক্তকরণে DNA টেস্ট”- বাবার দেহ পেতে লাইনে আট মাসের শিশুও

আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার AI171 বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় সৃষ্ট বিভীষিকা ক্রমশ গভীর হচ্ছে। তীব্র বিস্ফোরণে সৃষ্ট আগুনের গোলা সব কিছুকে গ্রাস করেছে, মৃতদেহগুলো পরিণত হয়েছে ঝামায়। এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতে প্রিয়জনের দেহাবশেষ শনাক্তকরণের একমাত্র ভরসা এখন ডিএনএ পরীক্ষা। বিমান যাত্রী-সহ দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের কাছে ডিএনএ নমুনা চেয়ে পাঠিয়েছে প্রশাসন।

আট মাসের শিশুর রক্তে পিতার শেষ চিহ্ন
বি জে মেডিক্যাল কলেজের সামনে এখন এক লম্বা লাইন – অশ্রুসিক্ত চোখে প্রিয়জনের দেহাবশেষের সামান্য চিহ্নটুকু পাওয়ার আশায় ভিড় করেছেন স্বজনহারা মানুষ। এই দীর্ঘ লাইনে দেখা মিলল এক আট মাসের শিশুরও। অভিশপ্ত সেই বিমানেই ছিলেন তার হতভাগ্য পিতা, তাই তার দেহাবশেষ শনাক্ত করতে শেষ ভরসা ওই খুদের রক্তে থাকা ডিএনএ নমুনা।

জানা গেছে, ব্রিটেনের বাসিন্দা মহম্মদ আদনান, তার স্ত্রী মানতাশা এবং আট মাসের ছেলে ইব্রাহিমকে নিয়ে ঈদ-উল-আযহা পালনের জন্য আহমেদাবাদে এসেছিলেন। ২১ জুনের ফিরতি টিকিট কাটা থাকলেও, লম্বা ছুটির আবেদন বাতিল হওয়ায় তিনি তড়িঘড়ি কর্মস্থলে ফিরতে বৃহস্পতিবারের লন্ডন গ্যাটউইকগামী ফ্লাইট AI171-এ একাই টিকিট কাটেন। কিন্তু সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওড়ার মাত্র ৩২ সেকেন্ডের মধ্যেই বিমানটি মেঘানিনগরে আছড়ে পড়ে এবং তার গন্তব্যে পৌঁছায়নি। এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ভয়াবহ ঘটনায় ২৩১ জন যাত্রী-সহ ১২ জন ক্রু মেম্বারই নিহত হয়েছেন। মৃতের তালিকায় খুদে ইব্রাহিমের বাবা আদনানের নামও রয়েছে।

আট মাসের খুদে ইব্রাহিমকে কোলে নিয়ে নমুনা দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে তার মামা নবীল বলেন, “এইটুকু বাচ্চার রক্ত ছাড়া তো ওর বাবাকে খুঁজে পাওয়ার কোনো উপায় নেই। এখানে আদনানের পরিবারের কেউ নেই। ওঁর স্ত্রী মানতাসার নমুনায় তো কাজ হবে না, তাই এই দুধের শিশুকে এখানে আনা।” নিহতের আত্মীয়ের মুখ থেকেই জানা গেল, স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথরের মূর্তির মতো অবস্থা মানতাসার। খুদে ইব্রাহিমকে এক মুহূর্তের জন্যও কোলছাড়া করতে চাইছেন না তিনি। অনেক বুঝিয়ে নবীল ইব্রাহিমকে নিয়ে নমুনা জমা দিতে এসেছেন।

১০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড: ভয়াবহতার এক নতুন মাত্রা
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, টেকঅফের ৩২ সেকেন্ডের মধ্যেই যখন AI171 বিমানটি আছড়ে পড়ে, তখন তাতে প্রায় ১.২৫ লক্ষ লিটার জ্বালানি ছিল। ফলে ভেঙে পড়ার সময় তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে, এবং সে সময়ে বিমান ও তার ধ্বংসস্তূপের আশপাশের জায়গার তাপমাত্রা প্রায় ১০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে পৌঁছে গিয়েছিল। এমন ভয়াবহ উত্তাপের কারণে বিমানটি টুকরো টুকরো হয়ে পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে। একই অবস্থা হয়েছে বি জে মেডিক্যাল কলেজের হস্টেল-সহ লাগোয়া বিল্ডিংগুলোরও। স্বাভাবিকভাবেই বিমানের যাত্রী ও দুর্ঘটনাস্থলে থাকা মানুষের পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা ভেবেই শিউরে উঠতে হচ্ছে।

বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল, গভীর শোকের আবহ
শুধু বিমানের ২৪১ জন যাত্রীই নন, এই ভয়াবহ মৃত্যুমিছিলে নতুন করে জুড়েছে আরও ৩৩টি নাম। শনিবার অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, বিমানটি ভেঙে পড়ার কারণে হস্টেল ও তার আশপাশে থাকা একাধিক সাধারণ মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হন। বিস্ফোরণের আগুনে ঝলসে গিয়েছে তাদের দেহও। এই ঘটনা আহমেদাবাদে এক অপূরণীয় শূন্যতা আর গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছে।

এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে, ডিএনএ পরীক্ষা যেন একমাত্র আলোকবর্তিকা, যা প্রিয়জনদের একটি শেষ পরিচয় এনে দিতে পারে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আহমেদাবাদ সহ গোটা দেশকে এক গভীর শোকের আবহে ডুবিয়ে দিয়েছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy