বিশ্বজুড়ে চলা চরম অর্থনৈতিক মন্দা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব বৃদ্ধির উদ্বেগের মাঝেই এক অভূতপূর্ব ও হাড়হিম করা সিদ্ধান্ত নিল ফেসবুকের মাদার কোম্পানি ‘মেটা’ (Meta)। বিশ্বখ্যাত ধনকুবের মার্ক জাকারবার্গের এই সংস্থা এবার একসঙ্গে বিশাল কর্মী ছাঁটাইয়ের (Meta Layoffs) পথে হাঁটল। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মেটার বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রায় ৮,০০০ কর্মীকে চিরতরে বিদায় জানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। আর এই নির্মম ছাঁটাইয়ের প্রথম ধাক্কাটি এসে লেগেছে এশিয়ার অন্যতম প্রধান আইটি হাব সিঙ্গাপুরে। সেখানকার কর্মীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, স্থানীয় সময় ভোর ৪টে নাগাদ তাঁদের ইনবক্সে পৌঁছে যায় চাকরি চলে যাওয়ার সেই অভিশপ্ত ইমেল। ভোরের আলো ফোটার আগেই শত শত কর্মীর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ (Bloomberg)-এর একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট অনুযায়ী, মেটা তাদের বিশ্বব্যাপী মোট কর্মী সংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশকে একঝটকায় ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ছাঁটাইয়ের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর আগ্রাসন। জাকারবার্গের নতুন লক্ষ্য হলো, সাধারণ রক্তমাংসের কর্মীদের ছাঁটাই করে সেই বাঁচানো অর্থ এবং কোটি কোটি ডলার সরাসরি এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ করা। এই মেগা ছাঁটাইয়ের আগে পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মেটার মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল ৭৮,০০০। তার মধ্য থেকেই ৮,০০০ জনকে সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আরও ৭,০০০ কর্মীকে তাঁদের বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে জোরপূর্বক এআই-নির্ভর প্রজেক্টের কাজে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। মেটা এবং এআই-এর এই চরম একত্রীকরণের ফলে বাকি কর্মীদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সংস্থার অন্দরেই তীব্র আতঙ্ক ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছিলেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্তের কারণে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারাবেন। ২০২৬ সালে এসে সেই মারাত্মক ভবিষ্যদ্বাণীই যেন অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে। মেটা-তে বর্তমানে ৬,০০০ শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও সেগুলিতে নতুন কোনো নিয়োগ না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সংস্থাকে পুরোপুরি এআই-চালিত করে তুলতেই এই কঠোর পদক্ষেপ। উল্লেখ্য, এই দফায় সবমিলিয়ে প্রায় ১৪,০০০ কর্মীকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করল মেটা। চলতি ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান বলছে, এই বছরের প্রথম কয়েক মাসেই বিশ্বজুড়ে ১ লক্ষ ১০ হাজার ২২৩ জন প্রযুক্তি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, যার মূল খলনায়ক হলো এই এআই। মেটার পাশাপাশি ই-কমার্স জায়ান্ট আমাজন (Amazon) এই বছর ১৬,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা করেছে এবং ওরাকল (Oracle) প্রায় ৩০,০০০ কর্মীকে ছেঁটে ফেলে সম্পূর্ণ এআই দিয়ে কাজ চালানোর পরিকল্পনা করেছে।
মেটার চিফ পিপল অফিসার জ্যানেল গেল জানিয়েছেন, মূলত ম্যানেজারের পদগুলি খালি করা হচ্ছে এবং সংস্থা এখন ছোট টিম নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। এই ছাঁটাইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রডাক্ট টিমের সদস্যরা। ছাঁটাইয়ের এই আশঙ্কার মাঝেই মেটার বিরুদ্ধে কর্মীদের ওপর ডিজিটাল নজরদারির এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে। জানা গিয়েছে, সম্প্রতি বিশেষ একটি সফ্টওয়্যার ব্যবহার করতে শুরু করেছে মেটা, যার মাধ্যমে কর্মীদের মাউসের নড়াচড়া ও অনলাইন গতিবিধির উপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখা হচ্ছিল। এই চরম গোপন নজরদারির বিরুদ্ধে সংস্থার অন্দরেই ১,০০০-এর বেশি কর্মী লিখিতভাবে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তবে কর্মীদের এই বিক্ষোভকে পাত্তা না দিয়ে মেটা স্পষ্ট জানিয়েছে, গুগল (Google) এবং ওপেনএআই (OpenAI)-এর সঙ্গে টেক্কা দিতে গেলে ২০编制৬ সালে এআই-এর পেছনে ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা ছাড়া তাদের কাছে কোনো উপায় নেই।





