মাওবাদী-মুক্ত ভারতের শেষ বাধা মিসির বেসরা? সারেণ্ডার গভীর অরণ্যে চলছে চূড়ান্ত রুদ্ধশ্বাস অভিযান

ঝাড়খণ্ডের সারেণ্ডার অরণ্য এখন রণক্ষেত্র। সিপিআই (মাওবাদী)-র সর্বশেষ পলিটব্যুরো সদস্য মিসির বেসরাকে ধরতে কোমর বেঁধে নেমেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, সারেণ্ডার গভীর জঙ্গলের একটি গ্রামে গা ঢাকা দিয়ে আছেন এই কুখ্যাত মাওবাদী নেতা। তাঁকে বাগে আনতে প্রায় ৪,০০০ জওয়ানের যৌথ বাহিনী—সিআরপিএফ, কোবরা এবং ঝাড়খণ্ড পুলিশ—পুরো জঙ্গল ঘিরে ফেলেছে। মিসির বেসরাকে ধরিয়ে দিতে ঝাড়খণ্ড সরকার এক কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছে।

৬৬ বছর বয়সি মিসির বেসরা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০০৯ সালে বিহার পুলিশের হেফাজত থেকে দুঃসাহসিক কায়দায় পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান মাথাব্যথা। সাগর বা অসীম মণ্ডল ছদ্মনামে পরিচিত বেসরা বহু ভয়াবহ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। ২০০৪ সালে ৩২ জন পুলিশকর্মীর প্রাণহানি থেকে শুরু করে নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর ডজনখানেক হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তাঁর নাম বারবার উঠে এসেছে।

বর্তমান অভিযানে বাহিনী এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছে। বেসরা যে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন, সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকে দিয়েও আত্মসমর্পণ করার আর্জি জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, জঙ্গলের ভেতরে নিরাপত্তা বলয় ক্রমশ ছোট করা হচ্ছে এবং রসদ পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন আত্মসমর্পণের পথই একমাত্র খোলা রয়েছে বেসরার সামনে। এই অভিযানকে মাওবাদীদের শেষ শক্তিকেন্দ্র ভাঙার ‘চূড়ান্ত অধ্যায়’ হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় সরকার।

নিরাপত্তা বাহিনী সারেণ্ডা অরণ্যের ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এক অভেদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে। ওড়িশা ও ছত্তিশগড় সীমান্তসহ সবকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ সিল করে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গলজুড়ে বসানো হয়েছে একাধিক ‘ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেস’ (FOB)। এ বছর মার্চে ভারত সরকার দেশকে মাওবাদী-মুক্ত ঘোষণা করলেও মিসির বেসরা ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম। পলিটব্যুরোর বাকি সব সদস্যরা হয় এনকাউন্টারে নিহত হয়েছেন, নয়তো আত্মসমর্পণ করেছেন।

সম্প্রতি ‘অপারেশন নবজীবন’-এর অধীনে ২৭ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছে, যাদের সঙ্গে বেসরার যোগসূত্র ছিল বলে জানা গেছে। এটি মাওবাদী সংগঠনের জন্য বড় ধাক্কা। গত ৭ বছরে প্রায় ৭,৪০৯ জন মাওবাদীকে গ্রেফতার এবং ৫,৮৮০ জনকে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মূল স্রোতে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। তবে মিসির বেসরার মতো মাস্টারমাইন্ডের আত্মসমর্পণই এখন বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য। সারেণ্ডার দুর্গম ঝোপঝাড় আর গভীর অরণ্যকে ঢাল করে তিনি এতদিন পালিয়ে বেড়ালেও, এবারের ঘেরাটোপ কতটা দৃঢ় তা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে। নিরাপত্তা এজেন্সিগুলোর দাবি, বেসরার পতন মানেই ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy