দক্ষিণবঙ্গে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে রাজ্য সরকার শুক্রবার এবং শনিবার (১৪ ও ১৫ জুন) সমস্ত সরকারি স্কুল (পাহাড়ি এলাকা ব্যতীত) বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক এবং অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। অভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষক মহল পর্যন্ত অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ছুটি দিয়েই কি সমস্যার সমাধান সম্ভব? সিলেবাস শেষ হবে কবে?
এক মাসের ছুটি শেষে ফের বন্ধ: জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি
গত ২ জুন, দীর্ঘ এক মাস দু’দিনের গরমের ছুটির পর রাজ্যের স্কুলগুলিতে ফের পঠন-পাঠন শুরু হয়েছিল। কিন্তু মে মাসের শেষ দিক থেকে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। পূর্ব মেদিনীপুরে গরমে ক্লাস চলাকালীন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩ জুন জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ মর্নিং স্কুল চালুর সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ৪ জুন জেলার সব প্রাথমিক স্কুল মর্নিংয়ে ক্লাস শুরু করে। তবে, পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ দ্রুত এই নির্দেশ বাতিল করে দেয়, কারণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংসদের নেই। চাপের মুখে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ তাদের মর্নিং স্কুলের নির্দেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হতে থাকে, কারণ দিনের বেলায় ক্লাসে তীব্র গরমে পঠন-পাঠন চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। একাধিক শিক্ষক সংগঠন পর্ষদকে চিঠি দিয়ে ফের মর্নিং স্কুল চালুর অনুরোধ জানায়। কিন্তু সেই অনুরোধে সাড়া না দিয়ে, বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে ঘোষণা করেন যে, শুক্রবার ও শনিবার এই দু’দিন সব সরকারি স্কুলে পঠন-পাঠন স্থগিত থাকবে।
স্কুল শিক্ষা দফতর পরবর্তী বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে জানায়, ক্লাস স্থগিত রাখা হলেও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্কুলে উপস্থিত থাকতে হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
মর্নিং স্কুল নাকি ছুটি: বিতর্কের কেন্দ্রে কী?
শিক্ষক সংগঠন ও অভিভাবকদের মূল বক্তব্য হলো, ইতিমধ্যেই এক মাসেরও বেশি সময় গরমের ছুটি ছিল। এখন আবার দু’দিন ছুটি দেওয়া হলে নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করা কীভাবে সম্ভব হবে? তাঁদের মতে, মর্নিং স্কুলই এই পরিস্থিতির একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারত। শিক্ষক সংগঠনগুলি এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে, এবং অভিযোগ তুলেছে যে রাজ্য সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, অভিভাবকেরাও ছুটি চান না, বরং চান সুষ্ঠু পঠন-পাঠন চালু থাকুক।
ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা বলছেন, “রোজ রোজ ছুটি দিয়ে কী হবে? সরকারি স্কুলে ভরসা রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ছে। আগে গরমে তিন মাস মর্নিং স্কুল হত। এখন তা না করে শুধু ছুটি দেওয়া হচ্ছে। এতে বাচ্চারা কিছুই শিখতে পারবে।”
এই পরিস্থিতিতে, শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠনের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদী কী প্রভাব পড়বে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।