অসমের রাজনীতিতে এখন ‘মিয়া মুসলিম’ শব্দবন্ধটি অত্যন্ত পরিচিত। রাজনীতির প্ররোচনায় সমাজের এক বড় অংশে বিভাজন স্পষ্ট হলেও, নিম্ন অসমের বোরোল্যান্ড কিন্তু এক ভিন্ন ছবি তুলে ধরছে। কোকরাঝাড়, চিরাং, তামুলপুর এবং উদালগিরির মতো জেলাগুলোতে এই বিভাজনমূলক স্লোগান তেমন দাগ কাটতে পারেনি। বোরো জনজাতির পাশাপাশি মুসলিম ও বাঙালি হিন্দুদের সহাবস্থান এখানে এক অনন্য সমীকরণ তৈরি করেছে।
আলাদা রাজ্যের স্বপ্ন বনাম বিটিআর (BTR)
একসময় আলাদা রাজ্যের দাবিতে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন দেখেছে বোরোল্যান্ড। ২০০৩ সালে ‘বোরোল্যান্ড টেরিটোরিয়াল রিজিয়ন’ (BTR) গঠনের পর আন্দোলন স্তিমিত হলেও ক্ষোভ পুরোপুরি মেটেনি। বিটিসি কাউন্সিলর ধ্যানেশ্বর গোয়ারির মতে, আলাদা রাজ্য না পেয়ে বিটিআর মেনে নেওয়া অনেকটা ‘নাকের বদলে নরুণ’ পাওয়ার মতো। তবুও শান্তির স্বার্থে সরকারের সঙ্গে চুক্তিতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরা। এখন তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য— উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রের বরাদ্দ অর্থ সরাসরি বিটিসির হাতে আসা।
ভোটের ময়দানে ত্রিমুখী লড়াই
বোরোল্যান্ডের ১৫টি বিধানসভা আসনে এবার লড়াই বেশ কঠিন।
BPF (বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট): ৪টি আসন বিজেপিকে ছেড়ে দিয়ে ১১টিতে লড়ছে তারা। একসময় কংগ্রেসের শরিক থাকলেও এখন এনডিএ-র সঙ্গে ঘর করছে হাগরামা মহিলারির দল।
UPPL (ইউনাইটেড পিপলস ফ্রন্ট লিবারেল): লরেন্স ইজলারির নেতৃত্বাধীন এই দল ষষ্ঠ তফশিলের মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনকে হাতিয়ার করে ১৫টি আসনেই এককভাবে লড়ছে। তাদের দাবি, বোরো আন্দোলনে বন্দি ২৫ জন কর্মীকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
কংগ্রেস: জোটসঙ্গী দল (মানস)-কে দুটি আসন ছেড়ে ১৩টিতে প্রার্থী দিয়েছে হাত শিবির।
নারী শক্তি ও বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা
বোরোল্যান্ডের রাজনীতিতে মহিলাদের ভূমিকা অপরিসীম। হাতে বোনা ‘দোখনা’ পরা বোরো মহিলাদের মধ্যে বিজেপির জনকল্যাণমূলক নীতিগুলোর বেশ গ্রহণযোগ্যতা দেখা যাচ্ছে। বিপিএফ কর্মী মৌসুমী বসুমাত্রির মতে, গেরুয়া শিবিরের নারী-কেন্দ্রিক নীতিগুলো তাঁদের আস্থা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, প্রবীণ শিক্ষিকা ফানজা ব্রহ্ম মনে করিয়ে দেন সেই হাজারো শহিদ মহিলার কথা, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বায়ত্তশাসন।
শান্তি কি স্থায়ী হবে?
অতীতের সেই সন্ত্রাসের বাতাবরণ কাটিয়ে ২০০৩ সালের পর শান্তি ফিরলেও তা কতটা স্থায়ী, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বোরো নয় এমন বাসিন্দাদের কাছে পুরনো দিনগুলো ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি আধিকারিক জানান, সে সময় প্রাণের ভয়ে ঘরের বাইরে বেরনো ছিল দায়। বর্তমানে বিটিসির অধীনে বোরো এবং অ-বোরোরা শান্তিতে থাকলেও, স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য কেন্দ্রীয় অনুদান ও সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এডিটরস নোট: বোরোল্যান্ডে যারাই জিতুক না কেন, তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হবে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা। কারণ, দিল্লি বা দিশপুরের সাহায্য ছাড়া এই দুর্গম ও সংবেদনশীল এলাকার উন্নয়ন অসম্ভব। তাই জোটের রাজনীতি এখানে আদর্শের চেয়ে স্বার্থরক্ষা ও শান্তির ওপরই বেশি নির্ভরশীল।





