ভারতের মিষ্টির মানচিত্রে বাংলা এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। আর এই গৌরবের মুকুটে অন্যতম উজ্জ্বল পালক হলো পূর্ব বর্ধমানের শক্তিগড়ের ‘ল্যাংচা’। কলকাতা-দুর্গাপুর হাইওয়ে দিয়ে যাতায়াত করেছেন অথচ শক্তিগড়ে গাড়ি থামিয়ে গরম ল্যাংচায় কামড় বসাননি, এমন ভোজনরসিক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এটি শুধু মিষ্টি খাওয়ার জায়গা নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক হাইওয়ে-সংস্কৃতি।
কেন শক্তিগড় এত স্পেশাল? শক্তিগড়ের ল্যাংচা মানেই গাঢ় মেহগনি রঙের, রসে টইটম্বুর এক অনবদ্য স্বাদ। দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি খোয়া ক্ষীর, ময়দা আর গাওয়া ঘির নিখুঁত মিশেলে তৈরি এই মিষ্টির ভিতরটা হয় অত্যন্ত নরম, আর বাইরেটা সামান্য কড়া ভাজা। আঙুলের মাপ থেকে হাতের চেটোর সমান—আকারে বৈচিত্র্য থাকলেও স্বাদে এরা সকলেই সেরা। ২৫০ মিটারের ছোট্ট এক জায়গায় প্রায় ৩০টির বেশি ল্যাংচার দোকান যেন দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছে এক ল্যান্ডমার্ক।
ল্যাংচার নামকরণের নেপথ্যে ইতিহাস ল্যাংচার জন্ম রহস্য নিয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল তাঁর ‘রূপমঞ্জরী’ উপন্যাসে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাসের কথা লিখেছেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৮ শতকের শেষদিকে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের এক কন্যা অসুস্থ হয়ে খাবার অরুচি বোধ করেন। পরে তিনি বর্ধমানের এক বিশেষ কালচে মিষ্টির কথা মনে করতে পারেন, যা বানাতেন এক খুঁড়িয়ে বা ‘লেংচে’ চলা ময়রা। সেই ময়রাকে রাজার আদেশে তলব করা হয় এবং তাঁর তৈরি মিষ্টি খেয়ে রাজকন্যার মুখে রুচি ফেরে। ময়রা ‘লেংচে’ হাঁটতেন বলেই এই মিষ্টির নাম হয় ‘ল্যাংচা’। পরে সেই ময়রা শক্তিগড়ে এসে বসতি গড়লে এই জায়গাটিই ল্যাংচার রাজধানী হয়ে ওঠে।
হাইওয়ে ফুড কালচার: ভারতে আরও আছে এমন নজির হাইওয়ের ধারে মিষ্টির দোকান মানেই এক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কিছু জায়গা আছে, যা নির্দিষ্ট কোনো মিষ্টির জন্য বিশ্বখ্যাত:
ওড়িশার পহলা: ছানাপোড়ার স্বর্গরাজ্য।
সালেপুর (ওড়িশা): রসগোল্লার অরিজিনাল স্বাদের ঠিকানা।
কৃষ্ণনগর (পশ্চিমবঙ্গ): সরভাজার জন্য বিখ্যাত।
পালানি (তামিলনাড়ু): পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় ‘পঞ্চামৃতম’।
গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়াহুড়োর চেয়েও যাত্রাপথের এই মিষ্টি বিরতি যেন ভ্রমণকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। আপনি পরবর্তী ভ্রমণে কোন ‘সুইট স্টপ’-এ থামার পরিকল্পনা করছেন?





