বিশ্ব রাজনীতির টালমাটাল পরিস্থিতি আর মধ্যপ্রাচ্যের রণহুঙ্কারে কাঁপছে বিশ্ব অর্থনীতি। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতের বাজারে। আন্তর্জাতিক স্তরে অশোধিত তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারে তৈরি হয়েছে টান। ঠিক এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতেই দেশবাসীর উদ্দেশে এক অভাবনীয় ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আবেদন জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আগামী এক বছর দেশবাসীকে সোনার গয়না বা নতুন সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার আর্জি জানিয়েছেন তিনি। ভারতীয় সংস্কৃতিতে যেখানে সোনা কেবল অলঙ্কার নয়, বরং আভিজাত্য ও বিনিয়োগের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র চর্চা।
কেন সোনা কেনায় নিষেধাজ্ঞা?
প্রধানমন্ত্রীর এই অনুরোধের নেপথ্যে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক উদ্বেগ। ভারত মূলত তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল এবং সোনার সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করে। এই দুই মূল্যবান সম্পদই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিনতে হয় মার্কিন ডলারে। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের ফলে বর্তমানে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যার জেরে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১২৬ ডলারে পৌঁছেছে। ভারত যেহেতু তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাই বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করতে হচ্ছে জ্বালানি আমদানিতে। এই পরিস্থিতিতে সোনা আমদানি করলে ডলারের ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং ভারতীয় রুপি ডলারের সাপেক্ষে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
রুপি বনাম ডলার: সংকটে দেশের পকেট
তেল একটি অপরিহার্য পণ্য; পরিবহন থেকে শিল্পক্ষেত্র—সব জায়গাতেই এর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই চাইলেও তেলের আমদানি কমানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, সোনা মূলত সঞ্চয় বা শখের জন্য কেনা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত যখন বেশি সোনা আমদানি করে, তখন দেশের ফরেক্স রিজার্ভ বা ডলার ভাণ্ডার দ্রুত খালি হতে থাকে। আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী চাইছেন, সংকটের এই সময়ে আমজনতা যেন সোনা কেনা কমিয়ে রুপিকে শক্তিশালী হতে সাহায্য করেন।
বিকল্প ব্যবস্থা ও আগামী দিনের সতর্কতা
উল্লেখ্য, এর আগেও ভারত সরকার সোনা আমদানিতে লাগাম টানতে শুল্ক বৃদ্ধি বা ‘সভেরেন গোল্ড বন্ড’-এর মতো বিকল্প বিনিয়োগের পথ দেখিয়েছিল। এবারও পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী সোনা কেনা কমানোর পাশাপাশি গাড়ি কম ব্যবহার করে পেট্রোল-ডিজেল সাশ্রয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। বিয়ের মরশুম সামনে থাকলেও, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই বছর অতিরিক্ত বিলাসিতা এড়িয়ে চলাই শ্রেয় বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। মধ্যপ্রাচ্যের মেঘ না কাটা পর্যন্ত ভারতের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখাই এখন সরকারের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।





