“বিমানটি বিধ্বস্ত হলো কেন?”- ইঞ্জিনের ক্ষমতা হ্রাস নাকি পাখির আঘাত? নানা তত্ত্ব ঘিরে জল্পনা

আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ মহলে গভীর উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাধারণত, টেক-অফ করার ২০০ ফুটের মাথায় পাইলট ল্যান্ডিং গিয়ার (পেছনের চাকা) তুলে নেন। অথচ, বৃহস্পতিবার লন্ডনগামী এআই ১৭১ ফ্লাইট যখন ৬২৫ ফুট উপরে, তখনও তার ল্যান্ডিং গিয়ার খোলা ছিল। এই অস্বাভাবিক ঘটনাই এখন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খোলা ল্যান্ডিং গিয়ার: ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত নাকি যান্ত্রিক ত্রুটি?
ড্রিমলাইনারের ককপিটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো অভিজ্ঞ পাইলটরা জানাচ্ছেন, ল্যান্ডিং গিয়ার তুলে না নেওয়ার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকতে পারে। ক্যাপ্টেন সুমিত সাবারওয়াল হয়তো বুঝেই গিয়েছিলেন যে তাকে জরুরি অবতরণ করতে হতে পারে। তাই, পরে ইঞ্জিনের সমস্যায় ল্যান্ডিং গিয়ার না খুললে তা আরও বিপদ ডেকে আনতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি হয়তো সেটি খোলাই রেখে দিয়েছিলেন। যদিও, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ল্যান্ডিং গিয়ার ভিতরে ঢোকেনি— এমন তত্ত্বও উঠে এসেছে। এছাড়াও, বিমানের ডানায় থাকা ফ্ল্যাপের কথাও উঠে আসছে। টেক-অফ ও ল্যান্ডিংয়ের সময় ওঠানামা করা এই ফ্ল্যাপ ঠিকমতো কাজ না করলেও গুরুতর সমস্যা হতে পারে।

৩০ সেকেন্ডের রহস্য: যা ঘটার, সম্ভবত তখনই ঘটেছে!
পাইলটরা জানাচ্ছেন, টেক-অফের ঠিক আগের মুহূর্তেও যদি বিমানে সামান্য ত্রুটি দেখা দিত, তাহলে পাইলট ‘অ্যাবর্ট টেক-অফ’ করতেন— অর্থাৎ টেক-অফ বাতিল করে বিমানকে রানওয়ের শেষ প্রান্তে গিয়ে থামাতেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার ক্যাপ্টেন সুমিত ‘অ্যাবর্ট টেক-অফ’ করেননি। এর অর্থ, টেক-অফের শুরুতেও কোনো ত্রুটি ধরা পড়েনি। রানওয়ে থেকে ৬২৫ ফুট উপরে উঠতে বড়জোর ২০ সেকেন্ড সময় লাগে। তাই, যা ঘটার, সম্ভবত ওই ২০ সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে গিয়েছে।

এক সিনিয়র পাইলট সর্বশেষ ভিডিয়ো ফুটেজ দেখে মন্তব্য করেছেন, “মনে হচ্ছে না যে এয়ারক্র্যাফ্ট ল্যান্ড করতে নামছে? ল্যান্ডিং গিয়ার খোলা। উইং ড্রপ করেনি। মিনিটে হাজার ফুট স্পিডে নেমে আসছে, ঠিক যেমন আমরা নামি।” তিনি আরও বলেন, “গ্লাইড পাথ-এ স্টেডি এয়ারক্র্যাফ্ট। তার মানে তখনও তো ইঞ্জিনের ৫০ পারসেন্ট কাজ করছে। দুটো ইঞ্জিন ফেল করলে এয়ারক্র্যাফ্ট অত স্টেডি থাকতেই পারে না। সে কেঁপে, শেক করে দুম করে উপর থেকে পড়বে।”

যদি ইঞ্জিনের ৫০ শতাংশ কাজ করে থাকে, তাহলে বিমানটি বিধ্বস্ত হলো কেন? এর উত্তরে একটি সম্ভাবনা উঠে এসেছে: বিমানটি উপরে ওঠার সময়ে ক্রমাগত স্পিড বাড়াতে হয় এবং দুটো ইঞ্জিনই তখন ফুল থ্রাস্টে থাকে। সম্ভবত পাইলট সেই স্পিড অ্যাক্সিলারেট করতে পারেননি। এর অর্থ, ইঞ্জিনের ক্যাপাসিটি কমতে শুরু করেছিল, যার জন্য বিমানকে ‘পুল-আপ’ করা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু, এত তাড়াতাড়ি দুটো ইঞ্জিন কীভাবে বিকল হয়ে গেল? এখানেই ‘পাখি ঢুকে যাওয়া’র প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাতেই কি বিকল হলো দু’টি ইঞ্জিন? পাইলটদের দাবি, ড্রিমলাইনারের ইঞ্জিন এত বড় যে একসঙ্গে একদল পাখি ইঞ্জিনে ঢুকে গেলে তবেই তার ক্ষতি হওয়া সম্ভব। এর অর্থ, দু’টি ইঞ্জিনেই একসঙ্গে এতগুলো পাখি ঢুকে পড়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও, ক্র্যাশ হওয়ার মুহূর্তের ভিডিয়োগুলিতে কোথাও পাখির দল দেখা যায়নি, ফলে এই তত্ত্বের সত্যতা নিয়ে পাইলটদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে।

তবে, ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে যাওয়া নিয়ে আরেকটি যুক্তিও উঠে এসেছে। বলা হচ্ছে, প্রায় ২০ বছর ধরে আহমেদাবাদ বিমানবন্দর ‘নোটাম’ (নোটিস টু এয়ারমেন) দিয়ে জানিয়ে আসছে যে বিমানবন্দরের চারপাশে প্রচুর পাখির উপদ্রব রয়েছে। বিমানবন্দরের পাঁচিলের বাইরে বেশ কিছু স্লটার হাউস (যেখানে মাংস কাটা হয়) রয়েছে, যার আকর্ষণে পাখিরা উড়ে বেড়ায়। ফলে, পাখির ধাক্কা লাগাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে, অস্বাভাবিক হলো একসঙ্গে দুটো ইঞ্জিনই পাখির ধাক্কায় বিকল হয়ে যাওয়া।

হাডসন নদীর অলৌকিক অবতরণ বনাম আহমেদাবাদের ট্র্যাজেডি
পাইলটরা জানাচ্ছেন, একটি ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে যাওয়া নতুন নয়। নতুন এয়ারক্র্যাফ্ট এমন ভাবে তৈরি হয় যে, টেক-অফের পরে একটি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলেও দ্বিতীয় ইঞ্জিনের পাওয়ার দিয়ে এয়ারক্র্যাফ্ট উড়ে যেতে পারে। কিন্তু দুটো ইঞ্জিনই খারাপ হলে কী হতে পারে, সেই প্রসঙ্গে ২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি ইউএস এয়ারওয়েজের ফ্লাইট নিউ ইয়র্ক থেকে সিয়াটল যাওয়ার পথে হাডসন নদীতে জরুরি অবতরণের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। সেদিন পাখির ধাক্কায় এয়ারবাস ৩২০ বিমানের দুটো ইঞ্জিনই বিকল হয়ে গেলেও পাইলট ১৫৫ জন যাত্রীকে নিয়ে নিরাপদে নিকটবর্তী হাডসন নদীতে নেমে এসেছিলেন। বৃহস্পতিবারের দুর্ঘটনার সঙ্গে তার মূল তফাৎ হলো—সেবার টেক-অফের পরে পাইলট কিছুটা সময় পেয়েছিলেন এবং হাতের সামনেই নদী ছিল। এখানে সে সুযোগ পাননি পাইলট।

অভিজ্ঞ পাইলটদের কথায়, আহমেদাবাদ থেকে গ্যাটউইকের লম্বা উড়ানের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০-৯০ টন জ্বালানি নিতে হয় বিমানকে। সাধারণত, আকাশে কোনো গন্ডগোল হলে যতটা সম্ভব জ্বালানি ফেলে ল্যান্ড করে বিমান। এখানে সেই সুযোগও পাননি পাইলট। বেশি জ্বালানি থাকলে দুর্ঘটনার পর আগুন আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, যা আহমেদাবাদের ক্ষেত্রে ঘটেছে।

‘অজেয়’ ড্রিমলাইনারের রহস্য: ব্ল্যাক বক্সের অপেক্ষায়
ড্রিমলাইনার সম্পর্কে পাইলটদের বক্তব্য, এটি ‘সেফেস্ট এয়ারক্র্যাফ্ট’ এবং একটি আধুনিক বিমান। প্রতিটি উড়ানের আগে প্রতিটি যন্ত্র খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং সামান্যতম কম্প্রোমাইজও করা হয় না। বর্তমানে ভারতের ড্রিমলাইনার কমাণ্ডারদের বিভিন্ন বিমান মিলিয়ে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ হাজার ঘণ্টা ওড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভেঙে পড়া বিমানের কমাণ্ডার সুমিত সাবারওয়ালের শুধু ড্রিমলাইনারেই ৮ হাজারের বেশি ওড়ার অভিজ্ঞতা ছিল।

অভিজ্ঞ এক পাইলট দুঃখ করে বলেন, “আমরা শকড। যে বিমানকে অজেয় বলা হয়, কী করে এভাবে ভেঙে পড়ল সে?” এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ব্ল্যাক বক্সের বিশ্লেষণ এবং বিস্তারিত তদন্তের দিকেই এখন সবার নজর। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনার কারণ নয়, বরং আধুনিক বিমান প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং অপ্রত্যাশিত ঝুঁকির এক জটিল প্রশ্ন।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy