পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এখন প্রবল ভূমিকম্প। বিধানসভায় বিরোধী দলের মর্যাদা এবং তৃণমূলের অন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে লড়াই শুরু হয়েছে, তা আজ এক চরম পরিণতির দিকে পৌঁছাতে চলেছে। দীর্ঘদিনের শাসকদলের ভিত যে এভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে, তা কল্পনাও করতে পারেননি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর দপ্তরে বুধবার দুপুরে জমা হওয়ার কথা ৫৯ জন বিধায়কের সই সম্বলিত একটি বিশেষ চিঠি। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার নেতৃত্বে এই গোষ্ঠীর দাবি, তৃণমূলের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখন তাঁদের হাতেই। সূত্রের খবর অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক ঋতব্রতদের শিবিরের সমর্থনে রয়েছেন, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে অবশিষ্ট রয়েছেন মাত্র ২১ জন বিধায়ক।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত মঙ্গলবার থেকেই জল্পনা তুঙ্গে ছিল। যদিও ঋতব্রত বিধানসভায় পৌঁছেও স্পিকারের দপ্তরে যাননি, তবে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে সই জালিয়াতি নিয়ে। দলের পক্ষ থেকে অভিষেকের পাঠানো চিঠিতে বিধায়কদের যে সই রয়েছে, তা জাল বলে দাবি করেছেন বহিষ্কৃত বিধায়করা। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডি তদন্ত শুরু করেছে, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এক বড় আইনি সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।
তৃণমূলের অন্দরের এই ফাটল কেবল পরিষদীয় দলেই সীমাবদ্ধ নেই, সংসদীয় দলের স্থায়িত্ব নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। মঙ্গলবার মমতার ধর্নায় হাতেগোনা কিছু নেতা ও সাংসদের উপস্থিতি সেই সংকটেরই জানান দিচ্ছে। উল্টোদিকে, ঋতব্রতর দাবি অনুযায়ী, শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে হাওড়া গ্রামীণের তৃণমূল বিধায়কদের যোগদান রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার দাবি করেছিলেন যে, তিনি হারেননি বরং তাকে হারানো হয়েছে। তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি—অর্থাৎ দলের নেতা-কর্মী এবং বিধায়কদের সমর্থন—দ্রুত ধসে পড়ছে। তৃণমূলের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ নেতারাও এখন প্রকাশ্যে বিদ্রোহী। এখন দেখার বিষয়, বুধবার বিধানসভায় স্পিকার রথীন্দ্র বসু কোন সিদ্ধান্ত নেন এবং তা তৃণমূলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর কী প্রভাব ফেলে। বাংলার রাজনীতি কি তাহলে দুই তৃণমূলের দ্বন্দ্বে নতুন কোনো মোড় নিতে চলেছে? উত্তর মিলবে খুব শীঘ্রই।





