পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভারতীয় বিপ্লবীদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দেওয়ায় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠেছে। গত বুধবার (৯ জুলাই, ২০২৫) স্নাতক স্তরে ষষ্ঠ সেমিস্টারের ইতিহাসের পরীক্ষায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্নপত্রে লেখা হয়েছে, “মেদিনীপুরের তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নাম করো, যাঁরা সন্ত্রাসবাদীদের হাতে নিহত হন?” প্রশ্নপত্রটি সামনে আসার পর থেকেই অধ্যাপক মহল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক স্তরে নিন্দার ঝড় বইছে।
শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়া
১২ নম্বর প্রশ্নে বিপ্লবীদের সরাসরি ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়ে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ফোনে সাড়া দেননি। তবে অধ্যাপকরা এর তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, “স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা গৌরবান্বিত ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসকে এতটা অপমান করা হলো! এই বিপ্লবীদের সন্ত্রাসবাদী বলে উল্লেখ করা যায় না। এটা সম্পূর্ণ ভুল। যেখান থেকে, যেভাবেই হোক না কেন, ভুলভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এটা খুব হতাশাজনক, দুঃখজনক, লজ্জাজনক।”
এই বিষয়টি সামনে আসার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে ই-মেইলে অভিযোগ জানিয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, “মেদিনীপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সরাসরি সন্ত্রাসবাদী বলা হয়েছে। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁরা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁদের আজ সন্ত্রাসবাদী বলা হচ্ছে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ভুলিয়ে দেওয়া, কালিমালিপ্ত করা, তাঁদের অবদানকে অস্বীকার করার চক্রান্ত করছে তৃণমূল।”
সম্প্রতি বলিউড ছবি ‘কেশরী’র বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষুদিরাম বসুকে ছবিতে ‘ক্ষুদিরাম সিংহ’ এবং প্রফুল্ল চাকীর নাম পাল্টে দেওয়া নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বাংলাকে অসম্মান করা হচ্ছে, বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অপমান করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। বিদ্যাসাগর কলেজের প্রশ্নপত্র নিয়েও বিরোধী শিবির ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলছে। যদিও এই ঘটনা সমর্থনযোগ্য নয় বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তৃণমূল।
শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার এই ঘটনাকে “দুর্ভাগ্যজনক এবং বিস্ময়কর” আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “যিনি প্রশ্নপত্র তৈরি করেছেন, তিনি কী ভাবেন, উপাচার্য ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। ভারতের যে বিশাল জনমত, যে বিপ্লবীরা সন্ত্রাসবাদী নন, তাঁরা দেশপ্রেম। ক্ষুদিরাম বসু, মাতঙ্গিনী হাজরার মতো স্বাধীনতা সংগ্রামী দিয়েছে মেদিনীপুর। সেখানে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপ্লবীদের সন্ত্রাসবাদী বলা হবে, আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে এই ঘটনা। যে অধ্যাপক প্রশ্নপত্র তৈরি করেছেন, নিশ্চয়ই তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাইবেন উপাচার্য। সেই ব্যাখ্যা আমাদের শোনা দরকার। তাঁর ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের বোধ ও বিচারের বিরুদ্ধে গিয়েছে। তাঁর লজ্জিত হওয়া দরকার।”
মেদিনীপুরের বিপ্লবী এবং প্রশ্নকর্তার দায়বদ্ধতা
প্রসঙ্গত, ১৯৩১ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে মেদিনীপুরে তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিপ্লবীদের হাতে নিহত হন:
১৯৩১ সালের ৭ এপ্রিল: জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেমস পেডিকে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে গুলি করে হত্যা করেন বিপ্লবী বিমল দাশগুপ্ত ও জ্যোতিজীবন ঘোষ।
এক বছর পর ১৯৩২ সালের ৩০ এপ্রিল: আরেক ম্যাজিস্ট্রেট রবার্ট ডগলাসকে জেলা বোর্ডের অফিসে ঢুকে হত্যা করেন বিপ্লবী প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য ও প্রভাংশুশেখর পাল।
পরের বছর ১৯৩৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর: মেদিনীপুরের একটি মাঠে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বার্নাড ই জে বার্জকে খুন করেন বিপ্লবী অনাথবন্ধু পাঁজা, মৃগেন দত্ত, ব্রজকিশোর চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ রায় ও নির্মলজীবন ঘোষ।
এই ঐতিহাসিক সত্যের বিপরীতে এমন প্রশ্ন কেন করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। গুগলে অনুবাদ করতে গিয়েই এমন বিপত্তি ঘটেছে কিনা, সেই প্রশ্নও উঠছে। কিন্তু দায়িত্বে থাকা কারও চোখে পড়ল না কেন, সেই নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদক্ষেপ
এমন পরিস্থিতিতে চাপের মুখে পড়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রশ্নকর্তা কে এবং মডারেশনের দায়িত্বে কে ছিলেন, তা নিয়ে পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার কাছ থেকে বিশদ রিপোর্ট তলব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আজকের (বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫) মধ্যেই রিপোর্ট জমা পড়ার কথা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন সকলের নজর।
ইংরেজ শাসকরা ভারতীয় বিপ্লবীদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে উল্লেখ করত। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পর নিজের দেশেই কেন বিপ্লবীদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে অভিহিত হতে হবে, সেই নিয়ে বিতর্ক চরমে পৌঁছেছে। এর আগে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ‘বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী’ বলা হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রে সরাসরি বিপ্লবীদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলা হয়েছে, যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশা প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন মহলে।





