ভাষা সন্ত্রাসের প্রতিবাদে বোলপুরে আয়োজিত এক মঞ্চ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আমি বেঁচে থাকতে এনআরসি ও ডিটেনশন ক্যাম্প হতে দেব না।” একইসঙ্গে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বাড়ি বাড়ি সার্ভে করতে এলে ‘হাতা-খুন্তি’ এবং ‘শঙ্খধ্বনি’ তুলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নিদানও দেন তিনি, যা এক নতুন ‘খেলা হবে’র ইঙ্গিতবাহী।
একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকেই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছিলেন। অসম, হরিয়ানা, দিল্লি-সহ বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ ওঠে। বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে বহু মানুষকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করার অভিযোগ তুলে বাংলাজুড়ে এই প্রতিবাদের ডাক দেন মুখ্যমন্ত্রী। সেদিনই তিনি জানিয়েছিলেন, বীরভূম থেকেই এই কর্মসূচি শুরু হবে। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বোলপুরে আজ বাংলা ভাষার উপর সন্ত্রাসের প্রতিবাদে এক পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হাঁটেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর হাতে কখনও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি, কখনও বর্ণপরিচয়ের অক্ষর দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়-সহ শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকেরা।
পদযাত্রা শেষে জাম্বুনি বাসস্ট্যান্ডে রবীন্দ্রমূর্তিতে মাল্যদান করেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর একটি পথসভা থেকে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপিকে সরাসরি আক্রমণ করেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “গুজরাটে বসে ভোটার লিস্ট তৈরি করছে। বিজেপির এজেন্সি, ডবল ইঞ্জিন সরকারের এজেন্সিরা এসব করছে। ভোটার তালিকা থেকে বাংলায় কারও নাম বাদ দিয়ে দেখুক। ছৌ-নৃত্য আছে, ঢোল আছে, শঙ্খধ্বনি আছে, দামামা বাজিয়ে দেব। আমার অনুরোধ, ভোটার তালিকা থেকে জেনুইন ভোটারদের নাম বাদ দেবেন না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বেঁচে থাকতে বাংলায় এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেব না। অসমে সাত লক্ষ নাম বাদ দিয়েছিল। তাদের মধ্যে হিন্দুও ছিল। এখানে হতে দেব না। জো হাম সে টাকরায়ে গা চুর চুর হো জায়ে গা।”
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সার্ভে করতে গেলে কী করা উচিত, সেই বিষয়েও তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমার বাংলার মা-বোনেরা, বাইরের কাজ করেন, ঘরেও হাতা-খুন্তি নিয়ে কাজ করেন। বাড়ি বাড়ি ভোটার তালিকার নিয়ে সার্ভে করতে হবে, কী করতে হবে বুঝে নিন। হবে নাকি একটা খেলা? আপনাদের মতো বন্দুক-গুলি নিয়ে যাব না। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি নিয়ে যাব।”
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আজ কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে, তাই এজেন্সি লাগিয়ে যা ইচ্ছে তাই করছে। নিজেরা টাকা কামাচ্ছ আর এজেন্সি লাগাচ্ছ অন্যদের। কেন্দ্রে এই সরকার ২৯ সাল পর্যন্ত থাকবে না। তখন বিজেপির লোকেরা কোথায় যাবেন। কোথায় যাবে ডবল ইঞ্জিন সরকার।” বক্তব্যের শেষে তৃণমূল নেত্রী বলেন, “দরকার হলে জীবন দেব, বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে দেব না।”
বোলপুরের এই পদযাত্রা ও সভামঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ভোটার তালিকা ইস্যুতে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন, যা বাংলার রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।