আহমেদাবাদের মেঘানিনগরে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় যে করুণ কাহিনিগুলো সামনে আসছে, তার মধ্যে অন্যতম মর্মান্তিক পাটনি পরিবারের ট্র্যাজেডি। মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে বাড়িওয়ালার উচ্ছেদের পর সুরেশ ও সীতা পাটনি তাদের চায়ের দোকানের উল্টোদিকের ফুটপাথেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘুমিয়ে ছিল তাদের ১৩ বছরের ছোট ছেলে আকাশ। কিন্তু আকাশপথে আসা এক অপ্রত্যাশিত বিপদ তাকেও রেহাই দিল না।
ঘুমন্ত আকাশের ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল
বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ৩৮ মিনিটে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট AI171 যখন বিজে মেডিকেল কলেজের ইউজি হস্টেলের ছাদে আছড়ে পড়ল, তখন ঘুমন্ত আকাশের ওপর যেন আকাশই ভেঙে পড়ল। বিমানটির ধ্বংসাবশেষ এবং অতি দাহ্য জেট জ্বালানি ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দ্রুত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘুমের মধ্যেই সেই আগুন স্পর্শ করে আকাশকে, আর্তনাদ করে ওঠে সে।
মাকে হার মানালো জেট জ্বালানির আগুন: এক অসহায় মায়ের আত্মত্যাগ
ছোট ছেলের সেই বীভৎস অবস্থা দেখে স্বাভাবিকভাবেই স্থির থাকতে পারেননি মা সীতা। চায়ের দোকানের উল্টোদিকের ফুটপাথে গিয়ে ছেলের গায়ের আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন তিনি। নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন জ্বলতে থাকা ছেলের শরীরের উপরে। কিন্তু বিমান জ্বালানির আগুন নেভানো তো অত সহজ নয়। সীতা সফল হতে পারেননি। উল্টে তাঁর শরীরের ডান পাশের একটা বড় অংশ পুড়ে যায়। ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি তিনি। জানা গেছে, তাঁর শরীরের ৫০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে এবং তাঁর অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সীতা পাটনির একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও। সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অসহায় মা উন্মত্তভাবে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন রাস্তায়। তার ঠিক পিছনেই দাউ দাউ করে জ্বলছে দুর্ঘটনাস্থল, ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশ। ভিডিওতে সীতাকে অন্যদের কাছে সাহায্য চাইতে দেখা গেলেও, সেই মুহূর্তে সকলেই দুর্ঘটনাস্থল থেকে পালাতে ব্যস্ত থাকায় কেউই তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। দুর্ঘটনাস্থল থেকে কয়েক ফুট দূরে একটি অটো এবং একটি বাসকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। একটি গাড়িও মুখ ঘুরিয়ে বিপরীত দিকে এগিয়ে আসছিল।
শেষ পরিচয় ও ভাইয়ের আর্তনাদ
পরে ময়নাতদন্তের জন্য আকাশের দেহ আহমেদাবাদ সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাবা সুরেশের ডিএনএ-র সঙ্গে আকাশের ডিএনএ মিলিয়ে তার দেহ শনাক্ত করা হয়েছে।
ভাইয়ের এই ভয়াবহ মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে তার দাদা কল্পেশ পাটনি। ‘মারো ভাই, মারো ভাই’ (আমার ভাই, আমার ভাই) বলে কেঁদেই চলেছে সে। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছেন তার বন্ধুরা এবং তার ঠাকুমা বাবিবেন পাটনি। তবে তিনিও মাঝে মাঝেই বলে উঠছেন, ‘আমার কানহাইয়াকে ফিরিয়ে দিন। আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না।’
এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ফ্লাইট AI171-এর ২৪২ জন আরোহীর মধ্যে ২৪১ জনেরই মৃত্যু হয়েছে। তবে অভিশপ্ত বিমানে না থেকেও আকাশের মতো অন্তত ২৪ জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে এই ঘটনায়। ১৩ বছরের ছোট্ট জীবনে আকাশের বিমানে চড়ার সুযোগ হয়নি। হয়তো কোনোদিন হতোও না। কিন্তু আকাশপথে আসা বিপদ তাকেও রেহাই দিল না, এক লহমায় শেষ করে দিল তার ফুটপাথের আশ্রয়, তার জীবন। এই ঘটনা আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এবং সাধারণ মানুষের ওপর তার করুণ প্রভাবের এক জীবন্ত প্রমাণ।