বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে পালাবদলের পাশাপাশি এবার এক নজিরবিহীন ‘সেতুবন্ধন’-এর সাক্ষী থাকল কলকাতা। দীর্ঘ ১৫ বছর পর বামপন্থীদের মুখপত্র ‘গণশক্তি’ সংবাদপত্রের পাতায় ফিরল সরকারি বিজ্ঞাপন। তাও আবার রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের সৌজন্যে। শনিবার ঘড়ির কাঁটা যখন শপথ অনুষ্ঠানের দিকে এগোচ্ছে, তখনই গণশক্তির প্রথম পাতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি সংবলিত সরকারি বিজ্ঞাপন দেখে চমকে উঠেছেন পাঠক থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক— সকলেই।
১৫ বছরের খরা কাটল এক বিজ্ঞাপনেই ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিজ্ঞাপনের তালিকা থেকে ব্রাত্য হয়ে পড়েছিল বামেদের এই মুখপত্র। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে কার্যত কোনো সরকারি বিজ্ঞাপনই সেখানে প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু ২০২৬-এ রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠিত হতেই সেই রীতির অবসান ঘটল। এদিন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথ অনুষ্ঠানের বার্তায় সেজে ওঠে গণশক্তির প্রথম পাতা।
রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা: সৌজন্য না কি কৌশল? বামপন্থী মুখপত্রে গেরুয়া শিবিরের হেভিওয়েট নেতাদের ছবি দেওয়া এই বিজ্ঞাপন ঘিরে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক মহলের একাংশ একে বিজেপির ‘inclusive’ বা সর্বজনীন রাজনীতির বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, শুভেন্দু অধিকারী সরকার হয়তো বোঝাতে চাইছে যে, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ বা রাজনৈতিক বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা কাজ করতে আগ্রহী।
আবার অন্য একটি মহলের মতে, এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ। বিশেষ করে প্রশাসনিক কাজে বাম জমানার অভিজ্ঞ আমলাদের নিয়োগ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক ইতিবাচক মন্তব্য এবং এরপর বাম মুখপত্রে সরকারি বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি এক নতুন ইঙ্গিতবাহী যোগসূত্র তৈরি করছে।
কী বলছে সিপিএম শিবির? যদিও এই বিজ্ঞাপন বিতর্ক নিয়ে সিপিএমের আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের সদর দপ্তর থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে দলের অনুগামীদের একাংশের দাবি, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন নেওয়া মূলত একটি বাণিজ্যিক বিষয়। এর সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের কোনো আপস নেই। এর আগেও বিজেপির দলীয় বিজ্ঞাপন গণশক্তিতে প্রকাশিত হওয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, সেবারও ‘বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত’ হিসেবেই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছিল বাম নেতৃত্ব।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা? বাংলার রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে যে চরম অসহিষ্ণুতা এবং সৌজন্যহীনতার অভিযোগ উঠত, এই বিজ্ঞাপনী পদক্ষেপ কি তার অবসান ঘটাবে? নাকি বাম-ভোটের সমীকরণ নিজের দিকে টানার এটি বিজেপির এক সুপরিকল্পিত কৌশল? প্রশ্নটি এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। সৌজন্য যাই হোক না কেন, দীর্ঘ ১৫ বছর পর গণশক্তির পাতায় সরকারি বিজ্ঞাপন ফেরাটা যে বাংলার সাংবাদিকতা ও রাজনীতির ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।





