নির্বাচন মেটার পরপরই রাজ্যে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের গতি আরও তীব্র হয়েছে। এবার পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জালে ধরা পড়লেন তৃণমূলের দাপুটে নেতা ও বিধাননগর পুরসভার কাউন্সিলর (এমআইসি) দেবরাজ চক্রবর্তী। রাজারহাট-গোপালপুরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী অদিতি মুন্সির স্বামী দেবরাজ তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে রাজনৈতিক মহলে পরিচিত।
মঙ্গলবার মধ্যরাতের কিছু পরে তাঁকে আটক করা হয় এবং দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে গ্রেফতার করা হয় বলে সূত্র মারফত জানা গিয়েছে। বুধবার সকালেও তাঁকে ভবানীভবনে নিয়ে গিয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে মূলত পুরনিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, তোলাবাজি এবং আর্থিক দুর্নীতির একাধিক মামলা রয়েছে।
বিজেপির প্রতিক্রিয়া ও ‘পাপ বিদায়’ পোস্ট
দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেফতারির খবর সামনে আসতেই ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী শিবির বিশেষত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
রাজারহাট-গোপালপুরের বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি তাঁর ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে ‘পাপ বিদায়’ লিখে একটি পোস্ট করেন, যা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়। বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্ব দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, উস্কানিমূলক আচরণ এবং বিরোধী কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগে লাগাতার সরব ছিলেন। তরুণজ্যোতি তিওয়ারি ছাড়াও বিজেপির একাধিক শীর্ষ নেতা সামাজিক মাধ্যমে এই গ্রেফতারিকে স্বাগত জানিয়ে পোস্ট করেছেন।
শুভেন্দু সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কাজকর্মের বিরুদ্ধে একের পর এক কড়া পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। নতুন সরকারের এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কোপ ইতিমধ্যেই পড়েছে একাধিক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার ওপর।
এর আগে পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলাতেই গ্রেফতার হয়েছেন তৃণমূলের প্রাক্তন হেভিওয়েট মন্ত্রী সুজিত বসু। এবার দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেফতারি সেই তালিকায় নতুন সংযোজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আর জি কর কান্ড থেকে শুরু করে সিন্ডিকেট রাজ ও তোলাবাজি—প্রতিটি বিষয়েই নবান্নের কড়া মনোভাবের কারণে শাসকদলের একের পর এক প্রভাবশালী নেতা এখন শ্রীঘরে।
ফলতা থেকে জাহাঙ্গিরের সরে দাঁড়ানো ও রাজনৈতিক সমীকরণ
একদিকে যখন দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেফতারি নিয়ে তোলপাড় চলছে, ঠিক তখনই ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন থেকে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের আচমকা নাম প্রত্যাহার করে নেওয়া রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ‘ঝুক গয়া পুষ্পা!’ স্লোগান তুলে বিরোধীরা দাবি করছেন যে, নতুন সরকারের প্রশাসনিক চাপ এবং গণরোষের ভয়েই তৃণমূল প্রার্থী ময়দান ছেড়ে পালালেন।
প্রাক্তন আইপিএস অফিসার নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তিত্বরাও দাবি করছেন যে, একের পর এক নেতার গ্রেফতারি এবং কোণঠাসা হয়ে পড়ার জেরে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত এখন চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে, দেবরাজ চক্রবর্তীর এই গ্রেফতারি আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার।





