ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় ১০ জুন, ২০২৬ এক অভূতপূর্ব দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ সাড়ে সাত দশকের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জওহরলাল নেহরুকে পিছনে ফেলে তিনি এখন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ধরে ক্ষমতায় থাকা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করে আজ প্রায় ১২ বছরের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনি এক অনন্য ইতিহাস গড়েছেন।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জওহরলাল নেহরু প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, কিন্তু তখন তিনি ছিলেন মনোনীত। ১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর তিনি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ১৩ মে ১৯৫২ থেকে ২৭ মে ১৯৬৪ পর্যন্ত নেহরু টানা ৪ হাজার ৩৯৮ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি আজ সেই সংখ্যাকে ছাপিয়ে গিয়ে ৪ হাজার ৩৯৯ দিনে পা রেখেছেন। এই মাইলফলক স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ভারতীয় রাজনীতির আকাশতলে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
তবে সংখ্যাতত্ত্বের বাইরে গিয়ে দেখলে, নেহরু এবং মোদির শাসনকাল ছিল দু’টি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের। নেহরু যখন দেশের হাল ধরেন, তখন ভারত সদ্য স্বাধীন। ৩৪ কোটির জনসংখ্যার সেই ভারত তখন দেশ গড়ার প্রাথমিক পর্যায়ে। তখন ছিল স্বাধীনতার আবেগ, দেশীয় রাজনীতির ক্ষেত্রটি ছিল প্রায় একচ্ছত্র। অন্যদিকে, ২০১৪ সালে যখন নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর গদি সামলালেন, তখন ভারত ১৩০ কোটির অধিক জনসংখ্যার এক বিশাল দেশ। একদিকে অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে ‘সুপারপাওয়ার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই—সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ ছিল নেহরুর তুলনায় বহুগুণ বেশি।
নেহরুর আমল ছিল ‘কংগ্রেস সিস্টেম’-এর যুগ, যেখানে বিরোধী দলগুলো সেভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম ছিল না। কেন্দ্রের নীতি রাজ্যে প্রয়োগ করতে তাঁকে তেমন বাধার মুখে পড়তে হতো না। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে মোদিকে লড়তে হয়েছে এক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে। একদিকে প্রবল শক্তিশালী বিরোধী দল, অন্যদিকে রাজ্যে রাজ্যে ছড়ানো প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তির অস্তিত্ব। উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি স্বাধীনতার আবেগ পাননি, পেয়েছিলেন দুর্নীতির জট, অচল প্রশাসনিক নীতি এবং লালফিতের ফাঁস। সেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মোদির এই দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করে তাঁর নেতৃত্বের দৃঢ়তা।
প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, সামাজিক প্রকল্পের বিস্তার এবং বিশ্বস্তরে ভারতের ভাবমূর্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টাই আজ তাঁকে দীর্ঘতম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছে। শুধু শাসনভারই নয়, বিরোধী শিবিরের এককাট্টা প্রতিরোধ ভেঙে যেভাবে তিনি গত ১২ বছর ধরে ভারতকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, তা রাজনৈতিক মহলে এক চর্চার বিষয়। ১০ জুনের এই সূর্যোদয় ভারতের রাজনীতির জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, যেখানে নরেন্দ্র মোদি শুধু একজন রাষ্ট্রনেতাই নন, তিনি হয়ে উঠেছেন আধুনিক ভারতের এক অবিচ্ছেদ্য অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই রেকর্ড শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি কোটি কোটি ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।





