১ জানুয়ারি, ২০২৬। নতুন বছরের ভোরে ভক্তি আর শ্রদ্ধার মেলবন্ধনে সেজে উঠেছে তিলোত্তমা। প্রতি বছরের মতো এ বছরও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অত্যন্ত সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে কল্পতরু উৎসব। বিশেষ করে দক্ষিণেশ্বর মন্দির, কাশীপুর উদ্যানবাটী এবং বেলুড় মঠে ভোর থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভক্তরা অপেক্ষা করছেন ঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। কিন্তু কেন বছরের প্রথম দিনটিকেই ‘কল্পতরু উৎসব’ হিসেবে পালন করা হয়? এর নেপথ্যে রয়েছে এক অলৌকিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাস।
১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি। তখন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব মারণ রোগ গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য তাঁকে উত্তর কলকাতার কাশীপুর উদ্যানবাটীতে রাখা হয়েছে। সেদিন বিকেলে তিনি একটু সুস্থ বোধ করায় বাগানে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। সেখানে ভক্তদের দেখে তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁর অন্যতম প্রিয় শিষ্য নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, “তোমার কি মনে হয়, আমি কে?” গিরিশচন্দ্র হাত জোড় করে উত্তর দিয়েছিলেন, “যাঁকে ব্যাস-বাল্মীকি বর্ণনা করতে পারেননি, আমি তাঁর সম্পর্কে কী বলব? আপনি মানবকল্যাণের জন্য মর্ত্যে অবতীর্ণ ঈশ্বরের অবতার।”
শিষ্যের এই গভীর বিশ্বাস দেখে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সেদিন সমাধিস্থ অবস্থায় উপস্থিত প্রত্যেক ভক্তকে স্পর্শ করেন এবং আশীর্বাদ করে বলেন— “তোমাদের চৈতন্য হোক।” লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সেদিন ঠাকুর স্বয়ং ‘কল্পতরু’ বা অভীষ্ট দানকারী বৃক্ষ হয়েছিলেন এবং ভক্তদের সমস্ত মনোবাঞ্ছা পূরণ করেছিলেন। সেই থেকে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি ভক্তরা এই বিশেষ দিনটি ‘কল্পতরু উৎসব’ হিসেবে পালন করেন। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে কল্পতরু হলো স্বর্গের এমন এক বৃক্ষ, যার কাছে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামার ইচ্ছাপূরণ করতে এই গাছ মর্ত্যে এনেছিলেন বলে জানা যায়।
এই উৎসব উপলক্ষে আজ ভোর থেকেই দক্ষিণেশ্বর, বেলুড় মঠ, কামারপুকুর এবং আদ্যাপীঠের মতো পবিত্র স্থানগুলোতে উৎসবের মেজাজ। রামকৃষ্ণ মহাশ্মশান থেকে শুরু করে সমস্ত ধর্মীয় কেন্দ্রে চলছে বিশেষ পূজা ও আরতি।
বিশাল জনসমাগমের কথা মাথায় রেখে কলকাতা পুলিশ কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে জারি হয়েছে বিশেষ ট্রাফিক নির্দেশিকা। বৃহস্পতিবার ভোর ৪টে থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বি.টি রোড এবং কাশীপুর রোড ধরে উত্তরমুখী পণ্যবাহী যান চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রবীন্দ্র সরণি, স্ট্র্যান্ড রোড, সিআর অ্যাভিনিউ সহ ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে পণ্যবাহী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কাশীপুর রোডের নির্দিষ্ট অংশে বিকেল ৪টে পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে ভক্তদের যাতায়াতে কোনও সমস্যা না হয়।