সাংসদ পদ হারিয়েছেন বটে, কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে দিলীপ ঘোষ যে এখনও এক প্রভাবশালী ও বিতর্কিত নাম, তা তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন। তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায়, “আমার এখনও মার্কেটে দাম আছে” – এই উক্তিই যেন তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিচ্ছবি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বীরভূম থেকে পরাজিত হলেও, বিজেপির অন্দরে তাঁর গুরুত্ব যে কমেনি, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলীয় পদ না থাকলেও, দিলীপ ঘোষকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ভাবার কোনো অবকাশ নেই।
রাজ্য দফতরে দিলীপের প্রত্যাবর্তন: ‘ঘরের ছেলে’ কি সক্রিয় হচ্ছেন?
মঙ্গলবার কলকাতায় রাজ্য বিজেপির সদর দফতরে দিলীপ ঘোষের উপস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে, তিনি আজও দলের ‘ঘরের ছেলে’। রাজ্যের মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিজেপি কার্যালয়ে তাঁর প্রবেশ মুহূর্তে অনুগামীদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। এই ছবি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা দেখে অনেকে ভাবতে শুরু করেছেন, দিলীপ কি তবে আবারও রাজ্য রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চলেছেন?
হঠাৎ দিল্লি সফর: ২০২৬-এর ব্লুপ্রিন্ট নিয়ে আলোচনা?
এরই মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে দিলীপ ঘোষের হঠাৎ দিল্লি সফর। বুধবার সকালে তিনি পৌঁছে যান বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরে, যেখানে তিনি দলের অন্যতম সংগঠক শিব প্রকাশের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। শিব প্রকাশ অতীতে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে ছিলেন, তাই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা সুদূরপ্রসারী। বৈঠকের পর বেরিয়ে দিলীপ ঘোষ জানান, মূলত ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি নিয়েই তাঁদের আলোচনা হয়েছে।
দিলীপের মন্তব্য ছিল বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ: “২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আরও ১০০ আসন দরকার। সেই লক্ষ্যেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে।” এই কথা বলার মধ্য দিয়ে তিনি যেন পরোক্ষে বুঝিয়ে দিলেন যে, আগামী নির্বাচনে বিজেপির পক্ষ থেকে আগেভাগেই জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, এবং সেই প্রস্তুতিতে তাঁকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হতে পারে।
নতুন দায়িত্বের জল্পনা ও দিলীপের কৌশলী উত্তর
তবে জল্পনা এখানেই থেমে থাকেনি। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এবার কি তবে দিলীপ ঘোষকে নতুন করে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হতে চলেছে? তিনি কি আবারও কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে দিলীপ কৌশলী জবাব দেন: “এখনও পর্যন্ত কোনো বাড়তি দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় কমিটি তৈরি হলে তবেই কিছু বলা যাবে।”
এই উত্তরের মধ্যেই নিহিত ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। দিলীপ ঘোষ ভালোই জানেন যে, তিনি এখনও দলের চোখে গুরুত্ব হারাননি। রাজ্য সভাপতি হিসেবে তাঁর কার্যকাল বহু বিতর্কে ঘেরা হলেও, সংগঠনকে মজবুত করতে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই কেন্দ্র চাইলে তাঁকে যে কোনো দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতেই পারে – এই বার্তা তিনি অপ্রত্যক্ষভাবে দিয়ে দিলেন।
ভবিষ্যতের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী হিসেবে দেখা যাবে কি না, এই প্রশ্নে দিলীপ বলেন, “দেখি পার্টি কীভাবে চায়। আমি তো বিধানসভায় আগে ক্যান্ডিডেট হয়েছি, লোকসভাতেও হয়েছি। পার্টির প্রয়োজনে যেটা দরকার, সেটা করব।” এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার, তিনি এখনও নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী এবং প্রয়োজন হলে মাঠে নামতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে, দিলীপ ঘোষের সাম্প্রতিক সক্রিয়তা ও মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে ফের এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি হয়তো আর সাংসদ নন, কিন্তু রাজনীতির ময়দান থেকে বিদায় নেওয়ার কোনো ইচ্ছে তাঁর নেই। বরং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের লক্ষ্যে তিনি এখন আরও একবার দলকে পাশে নিয়ে নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সময়ই বলবে, দিলীপ ঘোষের এই ‘দাম’ শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, তবে আপাতত তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, এটাই বাস্তব।





