‘ডেলিভারি বয়’ আসলে তরুণীর বন্ধু? পুনের চাঞ্চল্যকর ‘ধর্ষণ’ মামলায় নাটকীয় মোড়?

পুনের অভিজাত করোলবাগ এলাকার একটি ফ্ল্যাটে বুধবার সন্ধ্যায় এক তরুণীকে ক্যুরিয়র সংস্থার কর্মী পরিচয়ে ঢুকে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনাটি এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করার পর পুনে পুলিশ যে চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছে, তাতে হতবাক তদন্তকারীরা। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পুরো ঘটনাটি সম্ভবত সাজানো, এবং যে ‘ধর্ষণ’ নিয়ে এত তোলপাড়, তা হয়তো আদতে ঘটেইনি।

কমিশনারের চাঞ্চল্যকর তথ্য: অভিযুক্ত আসলে বন্ধু, সেলফি তুলেছে ‘নির্যাতিতা’ নিজে!

সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে পুনের পুলিশ কমিশনার অমিতেশ কুমার শুক্রবার জানান, ‘ধর্ষণে’ অভিযুক্ত ব্যক্তি আসলে অভিযোগকারী তরুণীর দীর্ঘদিনের বন্ধু। গত দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা একে অপরকে চেনেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ‘ধর্ষণের’ পর অভিযুক্ত তরুণীর সঙ্গে কোনো সেলফি তোলেননি, বা কোনো হুমকি বার্তাও তাতে লেখেননি। পুরো কাজটাই করেছেন ‘নির্যাতিতা’ নিজে! এর ফলে পুনেতে যে ‘ধর্ষণ’ নিয়ে এত তোলপাড় চলছিল, সেই ধর্ষণ আদৌ হয়েছিল কিনা, তা এখন এক বড়সড় প্রশ্নের মুখে।

যদিও কমিশনার অমিতেশ কুমার নিশ্চিত করেছেন যে, তারা ধর্ষণের তদন্ত বন্ধ করছেন না। বুধবার সন্ধ্যায় ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তরুণী বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং পুলিশ জানিয়েছে যে তিনি মানসিকভাবে খুব একটা সুস্থ নন। চিকিৎসকরা অনুমতি দিলে তার সঙ্গেও বিস্তারিত কথা বলা হবে। অন্য একটি সূত্রে খবর, ওই তরুণী মেডিকো-লিগ্যাল টেস্টে রাজি না হওয়ায়, তা এখনও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

তরুণীর প্রাথমিক অভিযোগ: ক্যুরিয়র বয় ও রাসায়নিকের ব্যবহার

তরুণী বুধবার রাত দেড়টা নাগাদ স্থানীয় থানায় ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অভিযোগে তিনি বলেন, “বুধবার সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ একজন ক্যুরিয়র বয় ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত নথি দিতে আসে। সে বলে যে পেন আনতে ভুলে গেছে, তাই আমি যেন আমার পেন নিয়ে এসে সই করে রিসিভ করি। সেই মতো আমি ভিতরে যেতেই ওই ব্যক্তি ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। আমি পেন নিয়ে বাইরের ঘরে আসামাত্র আমার মুখে কোনও কেমিক্যাল স্প্রে করে। তাতে আমি সংজ্ঞা হারাই। যখন জ্ঞান ফেরে ততক্ষণে ওই ব্যক্তি পালিয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারি আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। আমার মোবাইলে অভিযুক্ত একটা সেলফিও তুলেছে, কাউকে জানালে ফের সে আসবে বলে হুমকি-বার্তাও লিখে রেখেছে।”

এই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুনে পুলিশ দ্রুত ১০টি দল গঠন করে তদন্তে নামে। তরুণীর নাক ও গলা থেকে সোয়াব সংগ্রহ করে কী ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে, তা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। তাঁকে হাসপাতালে বাকি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ভর্তি করা হয়। তরুণীর ফোনের সেলফি থেকে অভিযুক্তের মুখের যে অংশ দেখা যাচ্ছিল, তার ভিত্তিতে একটি স্কেচও আঁকানো হয়।

তদন্তের অভিমুখ পরিবর্তন: অভিযুক্তের পরিচয় ও ফরেন্সিক রিপোর্ট

কিন্তু, সেই ব্যক্তি ধরা পড়তেই তদন্তের অভিমুখ সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। কমিশনার অমিতেশ কুমার জানান, “অভিযুক্ত কোনো ক্যুরিয়র সংস্থার কর্মী নন। তিনি অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত এবং একটি নামী সংস্থায় কর্মরত।”

এরপর তরুণীর ফোন একাধিকবার খতিয়ে দেখার পরে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন যে, সেলফিটি তরুণী নিজেই তুলেছেন। এরপর তিনি সেটি ক্রপ করে তাতে হুমকি বার্তা লিখেছেন। চিকিৎসকরা এবং ফরেন্সিক বিভাগও নিশ্চিত করেছেন যে, তার চোখেমুখে কোনো রাসায়নিক স্প্রে করা হয়নি।

পুনের যে কমপ্লেক্সে ওই তরুণী তার কলেজ-পড়ুয়া ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন, সেখানকার সিকিউরিটি গার্ডরা ও সেক্রেটারি জানিয়েছেন যে, যে সময়ে ‘ক্যুরিয়র বয়’ এসেছিলেন বলে মেয়েটি দাবি করেছেন, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখেও তেমন কাউকে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়নি। এই তথ্যগুলি তারা ইতিমধ্যেই পুলিশকে জানিয়েছেন।

এই ঘটনায় নতুন মোড় আসার পর পুনের এই চাঞ্চল্যকর মামলার পরিণতি এখন কী হয়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও আইন-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy