দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোয়াড (Quad) দেশগুলোর সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকটি ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ কূটনীতিকদের এই মিলনমেলা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি এবং অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং। মূলত চীনকে কাউন্টার করতেই এই জোটের নতুন পদক্ষেপগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে।
বৈঠক শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তিনটি প্রধান সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন, যা এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য যথেষ্ট। প্রথমত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী করা হবে। চারটি দেশ তাদের নজরদারি সক্ষমতা একীভূত করবে এবং সমুদ্রের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান করবে। এর ফলে পুরো অঞ্চলে ড্রাগন-বাহিনীর গোপন গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, কোয়াড তার প্রথম যৌথ আঞ্চলিক অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে ফিজির বন্দর উন্নয়নের কাজ হাতে নিয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে ঘিরে কোয়াডের এই উদ্যোগ চীনের জন্য বড় ধাক্কা। ফিজি যেহেতু আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার মধ্যকার সমুদ্রপথের সংযোগস্থলে অবস্থিত, তাই সেখানে কোয়াডের উপস্থিতি চীনের সামুদ্রিক পথকে প্রভাবিত করতে পারে। তৃতীয়ত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোয়াড ফুয়েল সিকিউরিটি ফোরাম গঠন করা হচ্ছে। সংকটকালে জ্বালানির ঘাটতি মেটাতে এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ ঠিক রাখতে এই জোট কাজ করবে।
চীনের সামরিক তৎপরতা এবং দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের আধিপত্য বিস্তারের নীতি নিয়ে কোয়াড দেশগুলো বরাবরই সরব। চীনের দাবি, তাদের এসব কার্যকলাপ শুধুমাত্র নিরাপত্তার খাতিরে। কিন্তু কোয়াডের নজরদারি শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত বেইজিংয়ের জন্য কোনোভাবেই সুখবর নয়। বেইজিং মনে করছে, কোয়াড আসলে তাদের প্রভাব খর্ব করার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
বৈঠকে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে তা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহের ওপর বিপর্যয় নেমে আনতে পারে। তাই সমুদ্রপথ উন্মুক্ত ও সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে চার দেশই একমত হয়েছে। দিল্লির এই বৈঠক স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিল যে, মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিশ্চিত করতে কোয়াড এখন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।





