গুরগাঁও থেকে ফিরছেন আতঙ্কিত পরিযায়ী শ্রমিকরা, রুটিরুজির সন্ধানে গিয়ে ‘বাঙালি’ তকমার শিকার

হরিয়ানার গুরগাঁও থেকে ফের আতঙ্কের ছাপ নিয়ে ঘরে ফিরলেন দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা ও উত্তর দিনাজপুর জেলার বহু পরিযায়ী শ্রমিক। সোমবারের পর মঙ্গলবার সকালেও একাধিক বাসে করে তাঁরা দক্ষিণ দিনাজপুরের বুনিয়াদপুর পুরসভার নারায়ণপুর এলাকায় পৌঁছন। এরপর সেখান থেকে নিজস্ব ব্যবস্থায় নিজেদের বাড়িতে ফিরে যান। কিন্তু ঘরে ফেরার স্বস্তি ছাপিয়ে তাদের মুখে এখন রাজ্যের কর্মসংস্থানহীনতা এবং ভিন রাজ্যে遭受 করা নিদারুণ অত্যাচারের কাহিনি।

এর আগে মালদা জেলার যে পরিযায়ী শ্রমিকরা ফিরেছিলেন, তারা হরিয়ানায় তাদের উপর চালানো পাশবিক নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছিলেন। মঙ্গলবারে ফিরে আসা শ্রমিকদের চোখেমুখেও সেই একই বিভীষিকার ছাপ স্পষ্ট।

ঘরে ফিরেও দুশ্চিন্তা: কাজের অভাব ও ভাতার অপ্রতুলতা

বাড়ি ফিরেই এই শ্রমিকরা নিজেদের নথি যাচাইয়ের জন্য বিডিও অফিস, পুরসভা এবং বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে ভিড় জমাচ্ছেন। তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা এখন একটাই – এখানে কাজ নেই। রাজ্য সরকার থেকে যে ভাতা পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। একরকম বাধ্য হয়েই তাদের রুটিরুজির সন্ধানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হচ্ছে।

বুনিয়াদপুর পুরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের রাঙাপুকুর এলাকার এক পরিযায়ী শ্রমিক জানান, “আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকায় বাস করছি। আমাদের বাপ-ঠাকুর্দা এখানকারই নাগরিক। আমাদের বৈধ নথিও রয়েছে। তারপরেও হরিয়ানায় আমাদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়া হচ্ছে, কারণ আমরা বাংলায় কথা বলি।” তিনি আরও বলেন যে, পুলিশের অত্যাচারের ভয়েই সকলে জীবন বাঁচাতে বাড়ি ফিরে এসেছেন।

‘বাঙালি’ হওয়ার মূল্য: অকথ্য নির্যাতন ও নিরাপত্তা সংকট

পরিযায়ী শ্রমিক আইনউদ্দিন মিঞা, যার জন্ম এই বাংলার মাটিতেই, হতাশা নিয়ে বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী আমাদের অনেক সাহায্য করেন। কিন্তু তারপরেও তো আমরা খেতে পাচ্ছি না। মেয়ের বিয়ে তো দিতে হবে। ভাতায় সংসার চলে না, তাই তো বাইরে যাচ্ছি।” তার কথায়, অভাবই তাদের ঠেলে দিচ্ছে ভিন রাজ্যের অনিশ্চিত জীবনের দিকে।

লিপিকা পারভিন নামে এক মহিলা পরিযায়ী শ্রমিক দিল্লিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। তার অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। তিনি বলেন, “দিল্লিতে আমাদের উপর অত্যাচার করছে। বাঙালিদের মারছে। এমনকি বিহারীদের উপরও অত্যাচার করছে। প্রশাসন কিছুই দেখছে না।” এই মন্তব্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

জেলা প্রশাসনের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বিপুল সংখ্যক ফিরে আসা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। পরিযায়ী শ্রমিকদের আক্ষেপ, জেলায় যদি পর্যাপ্ত কাজ থাকত, তবে তাদের এই চরম অনিশ্চয়তা ও নির্যাতনের শিকার হতে হতো না। এই ঘটনার পর রাজ্যের বাইরে কাজে যাওয়া শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এবং রাজ্যের কর্মসংস্থান নীতির কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy