বৃহস্পতিবার (১২ জুন) দুপুর ১টা বেজে ৩৯ মিনিটে রানওয়ে ২৩ থেকে উড়ান ভরেছিল এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিমান এআই-১৭১, যার গন্তব্য ছিল লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দর। কিন্তু উড়ানের মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই এটি এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়, ভেঙে পড়ে একটি মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলের উপর। এই মর্মান্তিক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি শব্দ – ‘মে-ডে’ কল। ডিজিসিএ (ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন) জানিয়েছে, পাইলট ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়াল উড়ানের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এই জরুরি সংকেতটি পাঠিয়েছিলেন।
কিন্তু কী এই ‘মে-ডে’ কল? এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর পেছনের ইতিহাসই বা কী?
‘মে-ডে’ কল: এক সার্বজনীন বিপদ সংকেত
‘মে-ডে’ হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিপদ সংকেত, যা আকাশপথ এবং জলপথে চূড়ান্ত জরুরি অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। মানুষ যখন আকাশে উড়তে শুরু করে, তখন থেকেই এই বিপদ সংকেতের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তারও আগে, জাহাজ ও অন্যান্য জলযানের ক্ষেত্রেও এর প্রচলন ছিল। ১৯২৭ সালে আন্তর্জাতিক রেডিও টেলিগ্রাফ কনভেনশনে এটি একটি আদর্শ বিপদ সংকেত হিসেবে গৃহীত হয়।
এর আগে, বিপদ সংকেত হিসেবে ‘এসওএস’ (SOS) শব্দটি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু রেডিয়ো সিগনাল দুর্বল হলে অনেক সময় ‘এসওএস’ শব্দটি স্পষ্ট ভাবে বোঝা যেত না, যা জরুরি পরিস্থিতিতে সমস্যা তৈরি করত। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ‘মে-ডে’র মতো একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর শব্দগুচ্ছের প্রয়োজন দেখা দেয়।
‘মে-ডে’র উৎপত্তি: ফরাসি ভাষার অবদান
‘মে-ডে’ শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘মাইদের’ (m’aider) থেকে। ফরাসিতে ‘মাইদের’ শব্দের অর্থ হলো, ‘আমায় সাহায্য করুন’। উচ্চারণের সহজবোধ্যতা এবং জরুরি অবস্থা বোঝানোর ক্ষমতা এই শব্দটিকে বিশ্বব্যাপী বিপদ সংকেত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
সাধারণত, বিপদ বোঝাতে ‘মে-ডে, মে-ডে, মে-ডে’ – পরপর তিনবার এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এর কারণ হলো, জরুরি পরিস্থিতিতে রেডিয়ো সিগনাল দুর্বল থাকতে পারে। এই অবস্থায় বিপদ এবং জরুরি অবস্থা স্পষ্ট ভাবে বোঝাতেই তিনবার পুনরাবৃত্তি করা হয়।
কারা ‘মে-ডে’ কল করতে পারেন এবং কখন?
জাহাজ হোক বা বিমান, ‘মে-ডে’ কল করার অধিকার থাকে সেই যানের কমান্ডারের। উড়ানের ক্ষেত্রে পাইলট এবং জাহাজের ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন এই সংকেতটি পাঠান।
‘মে-ডে’ কল তখনই করা হয় যখন কোনো চরম জরুরি অবস্থা তৈরি হয়, যা জীবন বা সম্পদের জন্য সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করে। এই জরুরি অবস্থাগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
ইঞ্জিন বিকল হওয়া বা যান্ত্রিক ব্যর্থতা: যখন বিমান বা জাহাজের কোনো গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক উপাদান কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
আগুন লাগা: বিমানে বা জাহাজে আগুন লাগলে।
নিয়ন্ত্রণ হারানো: পাইলট বা ক্যাপ্টেন যখন যানটির নিয়ন্ত্রণ হারান।
চিকিৎসাগত জরুরি অবস্থা: যদি জাহাজে বা বিমানে এমন কোনো গুরুতর অসুস্থতা বা আঘাত দেখা দেয় যার জন্য তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া: সন্ত্রাসী হামলা বা অন্য কোনো নিরাপত্তা হুমকি দেখা দিলে।
ফ্লাইট এআই-১৭১-এর ক্ষেত্রে, বিমানটি ওড়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ক্যাপ্টেন ‘মে-ডে’ কল করেছিলেন। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, টেকঅফের পরপরই বিমানটি কোনো অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল।
‘মে-ডে’ কলের পর কী ঘটে?
‘মে-ডে’ কল পাওয়ার পর, এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল বা বন্দর কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি পরিষ্কার করে দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো বিপদগ্রস্ত ফ্লাইট বা জাহাজটির সঙ্গে নির্বিঘ্নে এবং একচেটিয়া ভাবে যোগাযোগ স্থাপন করা।
এরপর পাইলট বা ক্যাপ্টেন জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত তথ্য দেন: কী ধরনের জরুরি অবস্থা, বিমান বা জাহাজের বর্তমান অবস্থান, বিমান হলে তা কোন উচ্চতায় আছে, বিমান বা জাহাজে কতজন লোক আছেন—এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানো হয়। কর্তৃপক্ষ তখন বিমান বা জাহাজের কমান্ডারকে জানতে চান তারা বিমানবন্দরে ফিরে আসতে চান কিনা বা জরুরি অবতরণ সম্ভব কিনা।
এরপর জরুরি প্রতিক্রিয়া প্রোটোকল সক্রিয় করা হয়। উদ্ধারকারী দল, অগ্নিনির্বাপক পরিষেবা এবং চিকিৎসা কর্মীদের নিয়ে একটি সমন্বিত প্রতিক্রিয়া দল গঠন করা হয়, যা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
‘মে-ডে’ কলের আইনি বাধ্যবাধকতা
‘মে-ডে’ কল করা হলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক এবং বিমান চলাচল নিয়ম অনুযায়ী, সেই কল শুনতে পাবে যে জাহাজ বা বন্দর কর্তৃপক্ষ বা এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল, তাদের কিছু নির্দিষ্ট প্রোটোকল এবং বাধ্যবাধকতা মানতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো সম্ভব হলে বিপদগ্রস্ত জাহাজ বা বিমানটিকে সাহায্য করা। যদি কেউ সক্ষম হয়েও ‘মে-ডে’ কলে সাড়া দিয়ে সাহায্য না করে, তাহলে তাকে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি পেতে হতে পারে।
এআই-১৭১-এর ‘মে-ডে’ কল তাই শুধু একটি শব্দগুচ্ছ ছিল না, এটি ছিল চরম বিপদের এক মর্মান্তিক আর্তনাদ, যা আহমেদাবাদের আকাশে চিরতরে মিশে রইল।





