ঐতিহাসিক ‘কেরল পিরাভি’ (কেরলের প্রতিষ্ঠা দিবস) উপলক্ষে সাফল্যের মুকুটে নয়া পালক যোগ করল দক্ষিণের বামশাসিত এই রাজ্যটি। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন (Pinarayi Vijayan) শনিবার আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কেরল আজ থেকে দেশের প্রথম ‘চরম দারিদ্রমুক্ত’ (Extreme Poverty Free) রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল।
শনিবার বিশেষ বিধানসভা অধিবেশনে এই মাইলস্টোন সাফল্যের কথা ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আজকের কেরল পিরাভি ঐতিহাসিক। আমরা কেরলকে ভারতের প্রথম দারিদ্র মুক্ত রাজ্য তৈরি করতে পেরেছি। এই বিধানসভা অধিবেশন অনেক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে। এবারের এই মুহূর্তটি সর্বোচ্চ মাইলস্টোন স্পর্শ করল। নতুন কেরলের জন্ম হলো।”
২০২১ সালে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার সময় যে অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার করেছিল, আজ সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হলো বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
📊 ‘চরম দারিদ্রমুক্ত’ বলতে কী বোঝায়?
‘চরম দারিদ্রমুক্ত’ বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যেখানে রাজ্যের প্রতিটি নাগরিক তাঁদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থানের মতো প্রাথমিক চাহিদাগুলি মেটাতে সক্ষম।
- বিশ্ব ব্যাঙ্কের মাপকাঠি: বিশ্ব ব্যাঙ্কের মাপকাঠি অনুযায়ী, দৈনিক ২.১৫ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১৮০ টাকা)-এর কমে জীবনযাপন করলে তা ‘চরম দারিদ্র’ হিসেবে গণ্য হয়।
- NITI Aayog-এর রিপোর্ট: নীতি আয়োগের ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেরলে দারিদ্রের হার ছিল তলানিতে। সে রাজ্যের মাত্র ০.৫৫ শতাংশ নাগরিক দরিদ্র হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন।
🛠️ কীভাবে সম্ভব হলো এই ‘অসাধ্য সাধন’?
বিজয়ন সরকার ব্যাখ্যা করেছে, এই সাফল্য অর্জনের জন্য একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল:
- সমীক্ষা ও শনাক্তকরণ: ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর ‘চরম দারিদ্র দূরীকরণ প্রকল্প’-এর সূচনা করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ‘কদম্বশ্রী’ ও আশা কর্মীদের দিয়ে ৩-৪ মাস ধরে সমীক্ষা চালানো হয়।
- প্রাথমিক তালিকা: প্রাথমিক ধাপে ১৪টি জেলায় সমীক্ষা চালিয়ে ৬৪ হাজার ৬টি পরিবার এবং এর অন্তর্ভুক্ত ১ লক্ষ ৩০ হাজার ৯ জন ‘চরম দরিদ্র’ ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়।
- সহায়তার ব্যবস্থা: শনাক্ত হওয়া প্রত্যেক পরিবার ও ব্যক্তির প্রয়োজন বুঝে বাড়িঘর, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের ব্যবস্থা করা হয়। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও জীবিকা খাতে সরকার ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ৮০ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ৫০ কোটি টাকা খরচ করেছে।
- বাসস্থান: চরম দরিদ্র নাগরিকদের জন্য ৩ হাজার ৯১৩টি বাড়ি তৈরি করা হয় এবং ১ হাজার ৩৩৮টি পরিবারকে জমি দেওয়া হয়। এছাড়াও, ৫ হাজার ৬৫১ পরিবারকে বাড়ি মেরামতের জন্য ২ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
- চূড়ান্ত সাফল্য: দফায় দফায় যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত তালিকায় থাকা ৫৯ হাজার ২৭৭টি পরিবারকে যথাযথ সহায়তার মাধ্যমে দারিদ্রমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
🗣️ বিরোধীদের কটাক্ষ
যদিও সরকারের এই ঐতিহাসিক ঘোষণাকে সম্পূর্ণ ভুয়ো এবং বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী UDF জোট। সরকারের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী UDF বিধায়করা বিধানসভার এই বিশেষ অধিবেশন বয়কট করেন।
প্রসঙ্গত, বিশ্বে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার কোনো অঞ্চল চরম দারিদ্রমুক্ত হলো। এর আগে, ২০২০ সালে দেশের প্রত্যেকটি রাজ্যকে দারিদ্রমুক্ত ঘোষণা করেছিল চীন।