পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি ২০২৬-এর নির্বাচনে এক আমূল পরিবর্তনের সাক্ষী থাকল। লোকসভা থেকে বিধানসভা—এতদিন যে রাজ্যে ‘বদলা’ আর ‘হুমকি’র রাজনীতি এক প্রকার দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ইভিএম-এর বোতাম টিপে বাংলার মানুষ সেই সংস্কৃতিকেই সপাটে প্রত্যাখ্যান করল। ভোটের প্রচারপর্বে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে ‘ডিজে’ বাজানো এবং ‘জলে চুবিয়ে রাখা’র হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল সেই আক্রমণাত্মক রণকৌশল বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে খোদ ঘাসফুল শিবিরের দিকেই।
ভোটের ফল বলছে, পশ্চিমবঙ্গ এবার ‘বদলা’ নয়, বরং ‘বদল’ এবং সুশাসনের পক্ষেই নিজেদের রায় দিয়েছে। গত কয়েক মাসে প্রচারের ময়দানে বারবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে শোনা গিয়েছিল চূড়ান্ত আগ্রাসনের সুর। কাটোয়ার জনসভা থেকে তিনি হুঙ্কার ছেড়েছিলেন, “মনে রাখবেন বদলা হবে ভোটের দিনে। ৪ তারিখ রবীন্দ্র সংগীতের সাথে গ্রামে ডিজে-ও বাজবে, তৈরি থেকো। আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো উদার নই।” এমনকি নন্দীগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, “বদলা হবে তো? আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, এবার ডিজে বাজবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই ‘বদলা’ নেওয়ার হুমকি সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের পরিবর্তে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। আরামবাগের সভায় অভিষেক আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন, “৪ তারিখ তৃণমূল আরামবাগ জিতুক বা হারুক… গতবার উদারতায় পার পেয়ে গিয়েছিলে। এবার আমি নিজে দায়িত্বে থাকব। ৪ তারিখ ১২টার পরে কোন জল্লাদের কত ক্ষমতা আর কার দিল্লির বাবা কাকে বাঁচাতে আসে, আমি দেখে নেব।”
কিন্তু ৪ মে ফলাফল আসতেই দেখা গেল অন্য ছবি। যে দাপট আর হুঙ্কার নিয়ে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব ময়দান কাঁপিয়েছিল, জনতা তার উত্তর দিয়েছে নিঃশব্দে। ‘আমি বিজেপি করি না’—এই মর্মে পোস্টার লাগানোর যে নিদান অভিষেক দিয়েছিলেন, তার কোনো প্রভাবই পড়েনি ভোটারদের ওপর। বরং সবুজ মুছে বাংলা এবার গেরুয়া আবীরে ঢেকেছে। মমতা এবং অভিষেকের বারবার দেওয়া ‘বদলা’র হুমকিকে খারিজ করে দিয়ে বাংলার ভোটাররা ক্ষমতা থেকেই টেনে নামিয়ে দিলেন তৃণমূল সরকারকে। দীর্ঘ ১৫ বছরের জমানার অবসান ঘটিয়ে নবান্নে এবার নতুন সূর্যোদয়। এই ফলাফল স্পষ্ট করে দিল যে, গণতন্ত্রে ‘জল্লাদ’ বা ‘দিল্লির বাবা’ নয়, শেষ কথা বলে সাধারণ মানুষই। আর সেই মানুষই আজ ‘বদলা’র হুমকির বদলে ‘বদল’ ছিনিয়ে নিল।





