চারপাশ একদম শান্ত, অথচ আপনার মনের ভেতর যেন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। কারও গলার স্বরের সামান্য পরিবর্তন, ঘরের হঠাৎ নীরবতা কিংবা ভবিষ্যতের অনাগত কোনো ঝুঁকি—সবকিছুই আপনার মস্তিষ্ক সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্লেষণ করে ফেলছে।
অনেকে একে ‘ওভারথিংকিং’ বা অতিরিক্ত চিন্তা বলে অবহেলা করলেও মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর একটি গাম্ভীর্যপূর্ণ নাম আছে—‘হাইপারভিজিল্যান্ট কগনিশন’ (Hypervigilant Cognition)। এটি কেবল সাধারণ চিন্তা নয়, বরং আপনার মস্তিষ্কের একটি বিশেষ ‘সারভাইভাল মোড’।
এটি কি ইচ্ছাকৃত কোনো সমস্যা?
একেবারেই না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সচেতনভাবে বেশি ভাবার কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বরং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা কিংবা অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো আবেগজনিত আঘাতের (Trauma) ফল। আপনার মস্তিষ্ক শিখে নিয়েছে যে, সব সময় সতর্ক থাকলেই কেবল নিরাপদ থাকা সম্ভব। ফলে বাস্তবে কোনো বিপদ না থাকলেও আপনার মস্তিষ্ক নিরন্তর সম্ভাব্য হুমকির খোঁজ চালিয়ে যায়।
মস্তিষ্কের ভেতরে আসলে কী ঘটে?
নিউরোসায়েন্স গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের মস্তিষ্কের হুমকি শনাক্তকারী অংশ ‘অ্যামিগডালা’ (Amygdala) এ সময় অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে:
-
ইতিবাচক দিক: আপনি খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন দ্রুত ধরতে পারেন এবং আগেভাগে সমস্যা অনুমান করতে পারেন। আপনার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি হয়।
-
নেতিবাচক দিক: মস্তিষ্ক সহজে ‘অ্যালার্ট মোড’ থেকে বের হতে পারে না। ফলে শরীরে টানটান ভাব থাকে এবং বিশ্রাম নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কেন একে ভুল বোঝা হয়?
যারা এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান না, তারা অনেক সময় এমন মানুষকে ‘অতিরিক্ত নেতিবাচক’ বা ‘ড্রামাটিক’ বলে মনে করেন। অথচ এটি কোনো মানসিক দুর্বলতা নয়, বরং একটি অভিযোজন প্রক্রিয়া। মস্তিষ্ক যে পরিবেশে টিকে থাকতে শিখেছে, তার ভিত্তিতেই এই সতর্কতা গড়ে উঠেছে।
শান্তি ফেরার উপায় কী?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নিজেকে দোষারোপ না করে নিজের মনের ভাষাকে বুঝতে হবে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে নিচের বিষয়গুলো সহায়ক হতে পারে:
-
রুটিন লাইফ: একটি সহজ ও পরিচিত রুটিন মেনে চলা যা মস্তিষ্ককে ‘নিরাপদ’ বোধ করায়।
-
ব্রিদিং এক্সারসাইজ: ধীর শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম নার্ভাস সিস্টেমকে শান্ত করে।
-
পেশাদার সহায়তা: যদি এই সতর্কতা আপনার সম্পর্ক বা কাজের ক্ষতি করে, তবে থেরাপি বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ।