রাজ্যের পট পরিবর্তনের আবহেই এবার কলকাতা কর্পোরেশনের অন্দরে তৈরি হলো চরম প্রশাসনিক অস্থিরতা। মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডের মধ্যে তৈরি হওয়া অদৃশ্য দূরত্ব এখন প্রকাশ্যে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তিতে নোটিশ পাঠানো থেকে শুরু করে তিলজলার অবৈধ নির্মাণ ভাঙার মতো একের পর এক ঘটনা ঘিরে পুর প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে যে সংঘাত দানা বেঁধেছিল, তা এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই হঠাৎ পুর সচিব স্বপন কুমার কুণ্ডুকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। তাঁর জায়গায় নতুন পুর সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন কিশোর কুমার গুপ্ত।
পুর কর্পোরেশন সূত্রে খবর, অশান্তির সূত্রপাত মাসিক অধিবেশন ডাকা নিয়ে। মেয়র পারিষদ বৈঠক ডাকা নিয়ে পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেন। কমিশনার সচিবের কাছে কৈফিয়ত চান যে, তাঁকে অন্ধকারে রেখে কেন এই বৈঠক ডাকা হলো। সূত্রের দাবি, সচিব তখন জানিয়েছিলেন যে আইন মেনেই সব কাজ হয়েছে এবং এই অধিবেশনের সর্বেসর্বা হলেন চেয়ারপার্সন। এরপরই বৃহস্পতিবার পুর সচিব স্বপন কুমার কুণ্ডু অধিবেশন বাতিলের নির্দেশিকা জারি করেন। এই নির্দেশিকা জারির পর মুহূর্তের মধ্যে কর্পোরেশনের অন্দরে তোলপাড় শুরু হয়। আর এর ঠিক পরেই সচিবকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা শাসকদলের অন্দরে নতুন করে জল্পনার সৃষ্টি করেছে।
এই গোটা ঘটনায় অস্বস্তিতে পড়েছেন কর্পোরেশনের চেয়ারপার্সন মালা রায়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, অধিবেশন বাতিলের বিষয়ে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। মালা রায়ের কথায়, “মাসে অন্তত একবার অধিবেশন করা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। না হলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। আমি এ বিষয়ে পুরমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব এবং চিঠি দেব।” এদিকে, মেয়র ফিরহাদ হাকিম ও কমিশনারের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হলেও, কমিশনার বিকল্প তারিখের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই প্রশাসনিক অস্থিরতার আসল কারণ অন্য জায়গায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তিতে পুরসভার নোটিশ পাঠানো নিয়ে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। সূত্রের খবর, দল থেকে মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কমিশনারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার জন্য। কিন্তু মেয়র সেই পথে হাঁটতে নারাজ। তাঁর মতে, ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনলে কমিশনার আইনি চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন। সেক্ষেত্রে বেআইনি নির্মাণের যুক্তি নিয়ে আদালতে পুর বোর্ড ও শাসকদলকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে শুক্রবার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের দলীয় কাউন্সিলরদের কর্পোরেশনে তলব করেছে। দলীয় নেতৃত্ব এই কৌশলী লড়াইয়ে কাউন্সিলরদের কতখানি পাশে পায়, এখন সেটাই দেখার। মেয়র ও কমিশনারের এই শীতল যুদ্ধ কি কর্পোরেশনের দৈনন্দিন কাজকে স্তব্ধ করে দেবে? এই প্রশ্ন এখন পুর মহলের প্রতিটি কোণে। শহরবাসী তথা রাজনীতিকদের নজর এখন শুক্রবারের পরিস্থিতির দিকে।





