আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেকেই হাঁটার মতো সহজ ও প্রাকৃতিক অভ্যাসটি থেকে দূরে সরে গেছি। কিন্তু শুনতে অবাক লাগলেও, দৈনিক হাঁটা আমাদের শরীরের জন্য এক অলৌকিক মহৌষধের মতো কাজ করে। এটি কেবল পেশী সুগঠিত করে বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে মেরামত করে না, বরং মস্তিষ্ককে সতেজ রেখে বার্ধক্য প্রতিরোধ করে, চিন্তার সৃজনশীলতা বাড়ায়, মেজাজ ভালো রাখে এবং মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে। স্নায়ুবিজ্ঞানী ও ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের গবেষক প্রফেসর শেন ও’মারা হাঁটার বিভিন্ন উপকারিতা তুলে ধরেছেন।
আসুন জেনে নিই হাঁটার সেই অসাধারণ গুণগুলি:
১. মস্তিষ্ককে সক্রিয় ও শক্তিশালী রাখে:
নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন কেবল পেশী শক্তিই কমায় না, বরং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও হ্রাস করে। আমরা যখন হাঁটি, তখন পেশীতে তৈরি হওয়া কিছু মলিকিউল বা অণু মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে সাহায্য করে এবং ব্রেনের কোষগুলোকে বিকশিত করে। ফলস্বরূপ, হাঁটলে মস্তিষ্ক আরও শক্তিশালী এবং সচল থাকে, যা বার্ধক্যজনিত সমস্যা প্রতিরোধে সহায়ক।
২. হার্টের স্বাস্থ্য সুরক্ষা:
হৃৎপিণ্ড ভালো রাখার জন্য হাঁটা অত্যন্ত উপকারী। আমাদের পূর্বপুরুষরা, যারা শিকার করে জীবন ধারণ করতেন, তারা দিনে প্রায় ১৫-১৭ মাইল হাঁটতেন এবং তাদের হার্টের স্বাস্থ্য বর্তমান মানুষের তুলনায় অনেক ভালো ছিল, যা প্রফেসর শেন ও’মারা উল্লেখ করেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার সিমানে গোত্রের ৮০ বছর বয়সী ব্যক্তির হার্ট ৫০ বছর বয়সী একজন আমেরিকানের হার্টের মতো কাজ করে, যার মূল কারণ তাদের সারাদিনের সক্রিয় জীবনযাপন।
৩. হজম প্রক্রিয়ার উন্নতি:
হাঁটা মানুষের পরিপাকতন্ত্রের জন্য এক বন্ধুর মতো কাজ করে। যখন আমরা বেশি হাঁটাচলা করি, তখন খাবার দ্রুত ও ভালোভাবে হজম হয়। কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যায় ওষুধ না খেয়ে হাঁটতে বের হলে তা অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়। নিয়মিত হাঁটাহাঁটির মাধ্যমে সহজেই হজমের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
৪. সমস্যা সমাধানে সহায়ক সৃজনশীলতা বৃদ্ধি:
হাঁটা যে আমাদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। এর ফলে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। শেন ও’মারা বলেন, “আপনি যখন কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করছেন তখন হতাশ হয়ে এক জায়গায় বসে না থেকে একটু হাঁটাহাঁটি করলে সেটা সমস্যা সমাধানে অনেক সহায়ক হয়।” বিখ্যাত লেখক স্টিফেন কিং, দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল সহ অনেক কিংবদন্তী তাদের জটিল সমস্যার সমাধান হাঁটার মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছেন।
৫. বিষণ্ণতা কাটাতে কার্যকর ‘ভ্যাকসিন’:
স্নায়ুবিজ্ঞানী শেন ও’মারা বলেছেন, বিষণ্ণতার সঙ্গে নিষ্ক্রিয়তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে বিষণ্ণতা বেশি দেখা যায়। অন্যভাবে বললে, যত বেশি সক্রিয় থাকা যায়, ততই ভালো থাকা যায়। রক্ত প্রবাহের সমস্যা থেকেও বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে, আর হাঁটাহাঁটি এই সমস্যাগুলিকে নাটকীয়ভাবে হ্রাস করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাঁটাহাঁটি করা এক ধরনের ‘ভ্যাকসিন’ বা টীকার মতো কাজ করে বিষণ্ণতা কমাতে।
৬. আরও খোলা মনের ও বহির্মুখী হতে সাহায্য করে:
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিষ্ক্রিয় থাকে তারা কম খোলা মনের, কম বহির্মুখী এবং তাদের মধ্যে স্নায়ুজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায়। এর বিপরীতে, সক্রিয় ব্যক্তিরা সাধারণত বেশি খোলা মনের, বহির্মুখী এবং তুলনামূলকভাবে কম অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়। হাঁটা আমাদের ব্যক্তিত্বের ইতিবাচক দিকগুলোকে বিকশিত করতে সাহায্য করে।
৭. বিপাক প্রক্রিয়ায় সহায়তা ও সঠিক শারীরিক গঠন:
আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তা বিভিন্ন শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। হাঁটাহাঁটি করা এই বিপাক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, সারা দিন ধরে অল্প মাত্রাতেও সক্রিয় থাকা জিমে গিয়ে এক ঘণ্টা শরীরচর্চা করার চেয়েও অনেক বেশি উপকারী। হাঁটাচলা আমাদের শারীরিক গঠন অটুট রাখতেও সাহায্য করে। যারা সারাদিন চেয়ারে বা গাড়িতে বসে কাজ করেন, তাদের পিঠে ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। মানুষের দেহ এমনভাবে তৈরি নয় যা সারাদিন একটি অবস্থানে থাকতে পারে। চেয়ার থেকে উঠে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করলে পিঠের ব্যথা সহ বিভিন্ন শারীরিক কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
সুতরাং, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পেতে দৈনিক হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা আজ অত্যন্ত জরুরি।