ইচ্ছাকৃত হোক কিংবা অনিচ্ছাকৃত, রাত জাগা আজকাল যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই রাতে জেগে কাজ করেন, আর ভোরের আলো ফুটলে যান ঘুমাতে। বিশাল কর্মব্যস্ততার এই শহরে আমরা নিজেদের শরীরের যত্ন নিতে ভুলেই যাই। এর ফলস্বরূপ অল্প বয়সেই বুড়িয়ে যাওয়া সহ একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, রাতের বেলা না ঘুমালে বা কম ঘুমালে আমাদের শরীরে কী কী সমস্যা হতে পারে:
১) স্থূলতা: রাত জাগলে ক্ষুধা বেড়ে যায় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার গ্রহণ করা হয়। এর সরাসরি পরিণতি হলো স্থূলতা বা অবেসিটি।
২) স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি: গবেষণায় দেখা গেছে, রাত জাগার কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি চারগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এছাড়াও অন্যান্য হৃদরোগের সম্ভাবনাও অনেক অংশে বৃদ্ধি পায়।
৩) ডায়াবেটিসের ঝুঁকি: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
৪) মস্তিষ্কের টিস্যু ক্ষয়: ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের টিস্যু নষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
৫) স্মৃতিশক্তি হ্রাস: ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে শুরু করে এবং নতুন কিছু মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়।
৬) পাকস্থলীর আলসার: ঘুমের অভাব অ্যাসিড নিঃসরণকে প্রভাবিত করে, যা পরবর্তীতে পাকস্থলীতে আলসারের রূপ নিতে পারে।
৭) কাজের ধারাবাহিকতা ও কর্মক্ষমতা হ্রাস: ঘুমের ঘাটতি কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে আনে, যার ফলে কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
৮) মনোযোগের অভাব: কোনো বিষয়ে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা দৈনন্দিন জীবন এবং কর্মক্ষেত্র উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে।
৯) সারাদিন ক্লান্তি: পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় সারাদিন ধরে ক্লান্তি ও ঝিমুনি অনুভব হয়, যা দৈনন্দিন কাজকর্মকে কঠিন করে তোলে।
১০) প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস: ঘুমের অভাবের কারণে গ্যামিট (শুক্রাণু ও ডিম্বাণু) কম তৈরি হয়, ফলে পুরুষ ও নারীর প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়।
১১) উচ্চ রক্তচাপ: রাত জাগার কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা হৃদরোগের একটি প্রধান কারণ।
১২) চোখের নিচে কালি: চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল বা কালো দাগ পড়ে, যা চেহারায় ক্লান্তির ছাপ ফেলে।
১৩) ত্বকের সমস্যা: ত্বকে ছোপ ছোপ দাগ পড়ে এবং ত্বকের স্বাভাবিক রঙ নষ্ট হয়ে যায়।
১৪) ত্বকের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া: ঘুমের অভাবের কারণে ত্বক দ্রুত কুঁচকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা তারুণ্য হারানোর অন্যতম কারণ।
১৫) মেজাজ খিটখিটে: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং সামান্য কারণেও বিরক্তি অনুভব হয়।
১৬) সারকোপেনিয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি: সারকোপেনিয়া এমন একটি জটিলতা যেখানে রোগী ধীরে ধীরে পেশী হারাতে থাকেন এবং ঘুমের অভাব এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
১৭) নারীদের মেদবহুল পেট ও মেটাবলিক সিনড্রোম: রাত জাগা নারীদের মধ্যে পেটে মেদ জমা এবং মেটাবলিক সিনড্রোম হওয়ার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
১৮) ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি: অতিরিক্ত রাত জাগার কারণে স্তন ক্যান্সার এবং প্রস্টেট ক্যান্সারের মতো ক্যান্সারের কোষ দেহে গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে!
দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখতে ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। নিয়ম মেনে প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমালে শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকা খুব সহজ। যাদের ঘুমের সমস্যা হয় অথবা রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে পারেন না, তাদের জন্য কিছু টিপস:
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করুন। অতিরিক্ত মশলা জাতীয় খাবার ত্যাগ করুন।
রাতের বেলা শোয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে সব ধরনের ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
হাত-মুখ ও পা ধুয়ে বিছানায় যাওয়ার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে ঘুমানোর আগে স্নান করে নিন।
বিছানায় শোয়ার আগে এক গ্লাস জল খান।
শোয়ার ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার করে ঘুমানোর অভ্যাস করুন।
যাদের জেনেটিক্যালি ঘুমের অসুবিধা আছে, তারা দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
পরিশেষে, মনে রাখবেন রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নত হলো এশার নামাজের পর যত দ্রুত সম্ভব ঘুমিয়ে যাওয়া। তাই সুস্থ ও সুন্দর জীবন যাপনের জন্য সঠিক ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা অপরিহার্য।