তীব্র গরমে এক গ্লাস ঠান্ডা জল যেন স্বর্গীয় শান্তি এনে দেয়। ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিসিনের পরামর্শ অনুযায়ী, ১৯ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষদের দৈনিক ৩.৭ লিটার এবং নারীদের ২.৭ লিটার জল পান করা জরুরি। কিন্তু এই ‘ঠান্ডা জল’ পান করা কি সত্যিই উপকারী, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি? বিতর্ক থাকলেও, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ঠান্ডা জলের কিছু ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
আসুন জেনে নেওয়া যাক, ঠান্ডা জল পানের সম্ভাব্য ৬টি মারাত্মক বিপদ সম্পর্কে:
১. শ্বাসকষ্ট ও সর্দি-কাশি বৃদ্ধি:
গবেষকরা দেখেছেন, ঠান্ডা জল পানে অনুনাসিক মিউকাস (নাকের শ্লেষ্মা) ঘন হয়ে যায়, ফলে শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যেখানে চিকেন স্যুপ বা গরম জল মানুষকে সহজে শ্বাস নিতে সাহায্য করে, সেখানে ঠান্ডা জল এর বিপরীত কাজ করে। তাই যদি আপনি সর্দি বা কাশির সমস্যায় ভোগেন, তাহলে ঠান্ডা জল পান করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকুন।
২. মাইগ্রেন ও মাথাব্যথার কারণ:
২০০১ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ঠান্ডা জল পান করলে মাইগ্রেন বা তীব্র মাথাব্যথা ট্রিগার হতে পারে। অর্থাৎ, ঠান্ডা জল পান করলেই মাথাব্যথা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
৩. অ্যাকলেসিয়া রোগীদের জন্য বিপদ:
অ্যাকলেসিয়া একটি বিরল অবস্থা যেখানে খাদ্যনালী থেকে খাবার পাকস্থলীতে যেতে সমস্যা হয়। যাদের এই সমস্যা আছে, তারা যদি খাবারের সঙ্গে ঠান্ডা জল পান করেন, তাহলে তাদের সমস্যা আরও বাড়তে পারে। ঐতিহ্যবাহী চীনা মেডিসিনেও গরম খাবারের সঙ্গে ঠান্ডা জল পান করাকে ভারসাম্যহীনতা তৈরির কারণ হিসেবে দেখা হয়।
৪. হার্টের উপর নেতিবাচক প্রভাব (ভেগাস নার্ভ উদ্দীপনা):
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ঠান্ডা জল পান করলে দাঁতের ভেগাস নার্ভের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। ভেগাস স্নায়ু হলো স্নায়ুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, যা হৃদগতি নিয়ন্ত্রণ করে। বেশি ঠান্ডা জল খেলে ভেগাস স্নায়ু উদ্দীপিত হয়ে ওঠে, যার ফলস্বরূপ হৃদগতি অনেকটাই কমে যেতে পারে। এটি একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।
৫. হজমের সমস্যা ও দেহের তাপমাত্রায় ভারসাম্যহীনতা:
ঠান্ডা জল পান করলে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে, কারণ এটি খাবারের হজমে ব্যাঘাত ঘটায়। এছাড়াও, শরীরচর্চা বা ওয়ার্কআউটের পর ঠান্ডা জল একেবারেই খাওয়া উচিত নয়। কারণ ওয়ার্কআউটের পর দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেড়ে যায়। এই সময় ঠান্ডা জল খেলে শরীরের তাপমাত্রায় আকস্মিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৬. রক্তনালি সংকোচন ও সংক্রমণের ঝুঁকি:
অতিরিক্ত ঠান্ডা জল রক্তনালিগুলিকে সঙ্কুচিত করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাওয়ার পর ঠান্ডা জল খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। এর ফলে শ্বাসনালিতে শ্লেষ্মার অতিরিক্ত আস্তরণ তৈরি হয়, যা থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়।
সুতরাং, গরম আবহাওয়ায় ঠান্ডা জলের লোভ সংবরণ করা কঠিন হলেও, এই স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সর্দি, কাশি, মাইগ্রেন বা হার্টের সমস্যা থাকলে ঠান্ডা জলের পরিবর্তে স্বাভাবিক তাপমাত্রার জল পান করা বুদ্ধিমানের কাজ।