আপনার ঘর কি সত্যিই জীবাণুমুক্ত? টয়লেটের চেয়েও ভয়ঙ্কর জীবাণু লুকিয়ে এই ১০টি সাধারণ জিনিসে!
আমরা সকলেই নিজেদের ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি। ঝাড়পোঁচ থেকে শুরু করে দামি ক্লিনার ব্যবহার—সবকিছুই করা হয় জীবাণুমুক্ত পরিবেশের আশায়। কিন্তু পরিষ্কার দেখালেই কি ঘর পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত হয়? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনেকের কাছেই অজানা। কারণ, আপনি যতই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন না কেন, ঘরের কিছু সাধারণ জিনিসে ভয়ঙ্কর জীবাণু লুকিয়ে থাকে, যা পরবর্তীতে পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং খালি চোখে দেখাও যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের ঘরে এমন বেশ কিছু জিনিস রয়েছে যেগুলোতে টয়লেটের চেয়েও বেশি জীবাণু বাসা বাঁধে। বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। আসুন, জেনে নেওয়া যাক সেই ১০টি জিনিস সম্পর্কে:
১. টুথব্রাশ রাখার হোল্ডার:
বাথরুমে টুথব্রাশ রাখলে তাতে জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে—এই তথ্যটি অনেকেরই জানা। তবে শুধু টুথব্রাশ নয়, এর হোল্ডারেও মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৭ শতাংশ টুথব্রাশ হোল্ডারে কলিফর্মের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যেখানে টয়লেট সিটে এর উপস্থিতি মাত্র ৫ শতাংশ। তাই নিয়মিত আপনার টুথব্রাশ হোল্ডার জীবাণুমুক্ত করুন অথবা বদলে ফেলুন।
২. বাথরুমের ট্যাপ বা কল:
টয়লেট সিটের তুলনায় বাথরুমের ট্যাপ বা কলে ২১ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে। শুধু তাই নয়, রান্নাঘরের কলে টয়লেট সিটের তুলনায় ৪৪ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া লেগে থাকে। সমীক্ষায় জানা গেছে, ই কোলাইয়ের মতো ড্রাগ রেসিস্টেন্স ব্যাকটেরিয়া পাইপের মাধ্যমে সিঙ্ক ও মানুষের হাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রতিদিন সিঙ্ক জীবাণুমুক্ত করুন এবং ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
৩. স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট:
২০১৮ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, টয়লেট সিটের তুলনায় একটি স্মার্টফোনে ৬ গুণ বেশি জীবাণু থাকে। ৫০টি ফোনের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, গড়ে একটি ফোনে ১৪৭৯টি ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যেখানে টয়লেট সিটে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা মাত্র ২২০টি। যদি কারও ফোনের ব্যাক কভার চামড়ার হয়, সেক্ষেত্রে টয়লেট সিটের তুলনায় ১৭ গুণ বেশি জীবাণু থাকতে পারে। টয়লেটে ফোন ব্যবহার করা বন্ধ করুন এবং নিয়মিত নরম ভেজা কাপড় বা ওয়াইপ দিয়ে আপনার ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক স্ক্রিন পরিষ্কার করুন।
৪. কম্পিউটারের কি-বোর্ড:
অনেকেই খেতে খেতে কম্পিউটারে কাজ করেন। অজান্তেই জীবাণু লেগে থাকে আপনার কি-বোর্ডে। লন্ডনের একটি অফিসের ৩৩টি কি-বোর্ড থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এক গবেষণা দল জানায়, কি-বোর্ডে টয়লেট সিটের তুলনায় ৫ গুণ বেশি জীবাণু থাকে। তাই হাত ধুয়ে কাজ করুন এবং কি-বোর্ড ঘন ঘন পরিষ্কার করুন।
৫. হাত ব্যাগ:
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই অফিস বা ট্রাভেলের সময় হ্যান্ডব্যাগ ব্যবহার করেন। এই ব্যাগেও বাসা বাঁধতে পারে ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়া! গবেষকরা ২৫টি হ্যান্ডব্যাগ পরীক্ষা করে দেখেছেন, গড় সংখ্যক হ্যান্ডব্যাগ টয়লেট সিটের তুলনায় ১০ গুণ বেশি নোংরা। ব্যাগের হাতলে সবচেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে। এছাড়াও ব্যাগে রাখা ক্রিম, লিপস্টিক বা লিপগ্লসের অবস্থাও ভয়াবহ হতে পারে। কাপড়ের ব্যাগ নিয়মিত পরিষ্কার করুন এবং প্লাস্টিক বা চামড়ার ব্যাগের ক্ষেত্রে জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন।
৬. ওয়াশিং মেশিন:
একটি অন্তর্বাসে প্রায় ১০ কোটি ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ। ওয়াশিং মেশিনে অন্তর্বাস ধোয়ার ফলে ওই ব্যাকটেরিয়া অন্য কাপড়েও মিশে যায়। ফ্রন্ট লোডিং মেশিনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, কারণ এর নীচে জল জমে থাকে, যা ব্যাকটেরিয়ার পছন্দের স্থান। টয়লেটের সিট শুকনো থাকায় সেখানে তুলনামূলকভাবে কম ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচতে প্রথমে ব্লিচ দিয়ে ওয়াশিং মেশিনের ভেতরের অংশ জীবাণুমুক্ত করুন এবং ঠাণ্ডা জলে অন্তর্বাস পরিষ্কার করুন।
৭. ফ্রিজের ড্রয়ার:
এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, ফ্রিজের সবজি ও মাংস রাখার স্থানটি হলো সবচেয়ে বেশি রোগ সৃষ্টিকারী মাইক্রোঅর্গানিজমের আস্তানা। খোলা সবজি বা মাংসের রস বিপজ্জনক জীবাণুর ধারক ও বাহক। তাই ফ্রিজের ড্রয়ার নিয়মিত গরম জল ও সাবান জল দিয়ে পরিষ্কার করে শুকিয়ে ব্যবহার করুন।
৮. রান্নাঘরের তোয়ালে, কাপড় বা স্পঞ্জ:
রান্নাঘরেও জীবাণুর অভাব নেই। বিশেষ করে রান্নাঘরের তোয়ালে, কাপড় ও স্পঞ্জে প্রতি স্কোয়ার সেন্টিমিটারে সাড়ে চার হাজার কোটি মাইক্রোবস থাকতে পারে। বাসন মোছার কাপড় ও স্পঞ্জে অধিক পরিমাণে ই কোলাই ও অন্যান্য ফিকাল ব্যাকটেরিয়া উপস্থিত থাকে। তাই প্রতি সপ্তাহে কাপড় ধোয়া ও মোছার কাপড় পরিষ্কার করুন এবং ডিশওয়াশারে স্পঞ্জ পরিষ্কার করুন। ভেজা স্পঞ্জ ৩০ সেকেন্ডের জন্য মাইক্রোওয়েভে রেখে দিন এবং প্রতি সপ্তাহে স্পঞ্জ ও কাপড় পাল্টে ফেলুন।
৯. কাটিং বোর্ড:
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, সবজি কাটার কাটিং বা চপিং বোর্ডে অনেক জীবাণু থাকে, যা টয়লেট সিটের তুলনায় ২০০ গুণ বেশি। মলের জীবাণুতে উপস্থিত থাকা ব্যাকটেরিয়াও কাটিং বোর্ডে পাওয়া গেছে। কাঁচা মাংস এই ব্যাকটেরিয়ার প্রধান উৎস। তাই প্রতিবার ব্যবহারের পর বাসন ধোয়ার সাবান দিয়ে প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড পরিষ্কার করুন এবং জলে দুই চা চামচ ব্লিচ মিশিয়ে বোর্ডটিকে সারারাত ডুবিয়ে রাখুন। কাঠের কাটিং বোর্ডের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করুন, তবে সারারাত ডোবানোর প্রয়োজন নেই।
১০. পোষা প্রাণীর খাবারের পাত্র:
পোষা প্রাণীর খাবারের পাত্রে প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া জমে থাকে। পোষা কুকুর বা বিড়ালের যদি টয়লেট সিট চাটার অভ্যাস থাকে, তবে তা আরও বিপজ্জনক। এক্ষেত্রে তারা সেখান থেকে প্রতি স্কোয়ার ইঞ্চিতে অবস্থিত ২৯৫টি পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া সংগ্রহ করতে পারে। আর শুধু নিজের খাবারের পাত্রের ভিতরের অংশ চাটলেই তার প্রতি ইঞ্চি থেকে ২,১১০টি পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই নিজের পোষা প্রাণীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ও ঘর জীবাণুমুক্ত করতে প্রতিবার খাবার দেওয়ার পর পাত্রটিকে সাবান-জল দিয়ে পরিষ্কার করুন অথবা সমপরিমাণ বেকিং সোডা, গরম জল ও লবণের মিশ্রণ দিয়েও পরিষ্কার করতে পারেন।
১১. টিভির রিমোট:
সবার ঘরেই টিভি ও রিমোট রয়েছে। তবে ক’জন নিয়মিত সেটি পরিষ্কার করেন? টিভির রিমোটেও বাসা বাঁধে হাজারো ব্যাকটেরিয়া। রিমোটের বোতামের ফাঁকে জীবাণু আটকে যেতে পারে। তাই অ্যান্টিসেপটিক ওয়াইপ দিয়ে নিয়মিত নিজের রিমোট পরিষ্কার করুন।
১২. কার্পেট:
ঘরের কার্পেটেও ব্যাকটেরিয়ার অভাব নেই। মৃত ত্বকের কোষ ব্যাকটেরিয়ার প্রিয় খাদ্য। প্রত্যেক মানুষের শরীর থেকে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৫ লাখ মৃত ত্বকের কোষ ঝরে পড়ে। এর সঙ্গে কার্পেটে থাকে খাবারের অংশ, পোষ্যের লোম বা নোংরা, ধুলো ইত্যাদি। এসব কারণে কার্পেটে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। কার্পেটের প্রতি স্কোয়ার ইঞ্চিতে প্রায় ২ লাখ পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা টয়লেট সিটের তুলনায় ৭০০ গুণ বেশি। ই কোলাই, স্ট্যাফিলোকক্কাস ও সালমোনেলার মতো বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়াও কার্পেটে বাসা বাঁধতে পারে। তাই কার্পেট পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করুন।
এই সাধারণ জিনিসগুলোর নিয়মিত ও সঠিক পরিচ্ছন্নতাই আপনার ঘরকে জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং আপনার পরিবারকে বিভিন্ন রোগ জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই আর অবহেলা নয়, আজ থেকেই আপনার ঘরের এই ‘জীবাণুর আখড়া’ গুলো পরিষ্কার করার কাজে লেগে পড়ুন।