স্পর্শেই নুয়ে পড়ে, গুণেই ভরপুর! লজ্জাবতীর অজানা ঔষধি ভান্ডার

বাংলায় ‘লজ্জাবতী’ নামে পরিচিত লতানো গাছটি শুধু স্পর্শকাতর পাতাই নয়, ঔষধি গুণেও ভরপুর। কেউ একে লাজুক লতাও বলেন। বর্ষজীবী এই গুল্ম আগাছা হিসেবে পরিচিত হলেও, এর পাতা ও মূল বহু রোগের উপশমে যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য:

লজ্জাবতীর কাণ্ড লতানো, শাখা-প্রশাখায় পূর্ণ এবং কাঁটাযুক্ত। লালচে রঙের এই কাণ্ড কিছুটা শক্ত এবং সহজে ভাঙে না। এর যৌগিক পাতা অনেকটা তেঁতুল পাতার মতো, যা স্পর্শ করলেই সঙ্গে সঙ্গে বুঁজে যায়। প্রতিটি পাতায় ২ থেকে ২০ জোড়া সরু ও লম্বাটে পত্রক থাকে। মে থেকে জুন মাসে বেগুনী ও গোলাপী রঙের উভলিঙ্গ ফুল ফোটে এবং জুলাই-আগস্টে ফল হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বীজ থেকে চারা গজায়।

উপকারী অংশ ও রাসায়নিক উপাদান:

লজ্জাবতীর পাতা ও মূল ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ। পাতায় এ্যাকোলয়ড়ে ও এড্রেনালিনের মতো উপাদান বিদ্যমান। এছাড়াও এতে মিমোসিন (Mimosa) এবং টিউগুরিনস্ (Tugurines) পাওয়া যায়। এর মূলে রয়েছে ট্যানিন।

ব্যবহার ও ঔষধি গুণ:

লজ্জাবতীর সমগ্র উদ্ভিদই ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর কিছু উল্লেখযোগ্য ঔষধি ব্যবহার নিচে আলোচনা করা হলো:

দাঁতের মাড়ির ক্ষত: দাঁতের মাড়িতে ক্ষত হলে ১৫ থেকে ২০ সেমি লম্বা মূল গাছসহ জলে সিদ্ধ করে সেই জল দিয়ে দিনে ৩ বার কুলকুচি করলে উপকার পাওয়া যায়।

পাইলস ও ফিস্টুলা: সাদা ফুলের লজ্জাবতীর পাতা ও মূল পিষে রস বের করে নিয়মিত খেলে পাইলস ও ফিস্টুলায় আরাম মেলে।

মিথুন দণ্ডের শৈথিল্য: লজ্জাবতীর বীজ দিয়ে তৈরি তেল মালিশ করলে তা দৃঢ়তা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

যৌনি ক্ষত: যে কোনো কারণে যোনিপথে ক্ষত হলে দুধ-জলে সিদ্ধ করা লজ্জাবতীর ক্বাথ দিনে ২ বার খেলে উপশম পাওয়া যায়। একই সাথে লজ্জাবতীর ক্বাথ দিয়ে ডুশ নিলে বা যোনিপথ ধুলে দ্রুত ক্ষত সারে।

আঁধার যোনি ক্ষত: হাঁটুর নিচে বা কুঁচকির দু’ধারে কৃষ্ণপক্ষে বেড়ে যাওয়া এবং শুক্লপক্ষে শুকিয়ে যাওয়া এই বিচিত্র ক্ষত নিরাময়ে মূল বাদে গাছের পাতা ১০ গ্রাম শুধু জল দিয়ে ক্বাথ করে খেতে হয় এবং ঐ ক্বাথ দিয়ে মুছতে হয়।

রমনে অতৃপ্তি: প্রসবদ্বারের শৈথিল্য কমাতে লজ্জাবতীর ক্বাথের ডুশ এবং গাছের পাতা সিদ্ধ করে তৈরি তেলে ন্যাকড়া ভিজিয়ে যোনিপথে রাখলে উপকার পাওয়া যায়। অণ্ডকোষের জল জমা সারাতেও পাতার পেস্ট ব্যবহার করা হয়।

আমাশয়: পুরনো আমাশয়ের সমস্যায় ১০ গ্রাম লজ্জাবতীর ডাঁটা ও পাতা ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে ১ কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে সেই ক্বাথ খেলে উপকার পাওয়া যায়।

দুর্গন্ধ দূর করতে: ঘামে দুর্গন্ধ হলে লজ্জাবতী গাছের ডাঁটা ও পাতার ক্বাথ তৈরি করে বগল ও শরীরে লাগালে বা মুছলে দুর্গন্ধ দূর হয় এবং জামাকাপড়ের হলদে দাগও কমে।

মল গুলটে হয়ে যাওয়া: মলের সমস্যায় ৭/৮ গ্রাম মূল থেঁতো করে সিদ্ধ করে ছেঁকে সেই জল খেলে উপকার পাওয়া যায়।

লজ্জাবতী শুধু একটি লাজুক লতাই নয়, প্রকৃতির এক অমূল্য দান। এর ঔষধি গুণাগুণ আমাদের সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য হতে পারে। তবে যেকোনো রোগের চিকিৎসায় ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহারের আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy