বসের ধমক আর সহকর্মীর জ্ঞান: কর্মক্ষেত্রে ‘কমন সেন্স’-এর অভাব ডেকে আনে অস্বস্তি

অফিসের কর্মব্যস্ত পরিবেশে যখন একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী হঠাৎ করে বসের ডেস্কে গিয়ে বেতন বৃদ্ধির আবদার শুরু করেন, তখন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বসের ধমক খেয়ে চুপসে যাওয়া সেই কর্মীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য এক কর্মচারী যখন মৃদু স্বরে বলে ওঠেন, ‘কমন সেন্স বাড়াতে হবে’, তখন বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে – দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ জ্ঞানের অভাব অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
আমরা অনেকেই হয়তো ‘কমন সেন্স’ বা সাধারণ জ্ঞান বাড়ানোর কথা শুনেছি, কিন্তু খুব কম লোকই হাতে ধরে শিখিয়ে দেন কোন কাজগুলো আসলে সাধারণ জ্ঞানের আওতায় পড়ে আর কোনগুলো নিছকই ব্যক্তিগত অভিরুচি। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কিছু সাধারণ জ্ঞান মেনে চললে ব্যক্তিত্বের হানি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।
তবে, এই ‘কমন সেন্স’ আসলে কী? ব্রিটানিকা ডিকশনারির মতে, কমনসেন্স হলো চিন্তা করার সক্ষমতা এবং একটি ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য উপযুক্ত আচরণ। নিউজিল্যান্ডের ওয়াকাতো হ্যামিল্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত গার্ট জি.ও. ফ্লিকচারের ‘সাইকোলজি ও কমনসেন্স’ শীর্ষক গবেষণা পত্রে কমনসেন্সকে তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
১. সাধারণ অনুমান: সামাজিক ও দৈহিক জগতের প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ধারণা।
২. সামাজিক রীতিনীতি ও বিশ্বাস: সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত এবং বহুল প্রচারিত প্রথা ও বিশ্বাস।
৩. ছড়িয়ে দেওয়া চিন্তা বা ধারণা: সামাজিক ও দৈহিক জগৎ সম্পর্কে সাধারণভাবে প্রচলিত ধারণা বা মতামত।
আসুন, এবার জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু ছোটখাটো বিষয় সম্পর্কে, যা আমরা প্রায়শই না জেনে বা খেয়াল না করে ভুল করে ফেলি এবং যা আমাদের ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে:
>> দরজার সঠিক ব্যবহার: তাড়াহুড়োয় অনেকেই সশব্দে দরজা বন্ধ করেন, যা একই বিল্ডিংয়ে বসবাসকারী অন্যান্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হতে পারে। তাই বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বা অফিসে প্রবেশের সময় দরজা আলতো করে টেনে বন্ধ করুন।
>> সিঁড়িতে নীরবতা: সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দ্রুত নামলেও খেয়াল রাখুন আপনার জুতার শব্দ যেন অন্যদের অস্বস্তি না ঘটায়। বিশেষত আবাসিক এলাকায় ধীরে এবং শব্দহীনভাবে নামা উচিত।
>> রাস্তা পারাপারে সচেতনতা: রাস্তা পার হওয়ার সময় ধৈর্য ধরুন এবং আগত গাড়িকে প্রথমে যেতে দিন। রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ করে হাত তুলে দাঁড়ালে চালকের পক্ষে দ্রুত ব্রেক করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
>> যানবাহনে সংযমী কথোপকথন: গণপরিবহনে বা অফিসে ফোনে কথা বলার সময় নিজের কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণে রাখুন। এমন উচ্চস্বরে কথা বলা উচিত নয় যাতে পাশের যাত্রীরা বা সহকর্মীরা আপনার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। যথাসম্ভব নিম্নস্বরে এবং প্রয়োজনীয় কথা বলুন।
>> ফুটপাতের নিয়ম: ফুটপাতে হাঁটার সময় অন্য পথচারীদের জন্য জায়গা ছেড়ে চলুন। গা এলিয়ে হাঁটলে পেছনের মানুষের অসুবিধা হতে পারে। একইভাবে, হাঁটার সময় হাত বেশি নাড়াচাড়া করলে আপনার পেছনের কারো শরীরে আঘাত লাগতে পারে।
>> বাসে বসার শালীনতা: বাসে একটি আসনে দুজন বসলে নিজের পা যতটা সম্ভব গুটিয়ে বসুন। একজন যদি পা ছড়িয়ে বসেন, তবে অন্যের বসার জায়গা কমে যায় এবং অস্বস্তি সৃষ্টি হয়।
>> ব্যক্তিগত প্রশ্নে সংযম: কারো বেতন, পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর, সিজিপিএ বা আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে হঠাৎ করে জিজ্ঞাসা করা অভদ্রতা। ব্যক্তিগত বিষয়ে আগ্রহ দেখানো উচিত তবে তা শালীন এবং সময়োপযোগী হতে হবে।
>> জনসমক্ষে দুর্বলতা নিয়ে ঠাট্টা নয়: জনসম্মুখে কারো দুর্বল দিক নিয়ে মজা করা বা তাকে হেয় করা উচিত নয়। এমনকি ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সহকর্মীর ক্ষেত্রেও এই ধরনের আচরণ অন্যের মনে কষ্ট দিতে পারে।
এই ছোট ছোট বিষয়গুলো হয়তো আপাতদৃষ্টিতে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, কিন্তু এগুলোই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অন্যের চোখে আমাদের ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটায়। সামান্য সচেতনতা এবং সাধারণ জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমেই কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে একজন রুচিশীল ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করা সম্ভব। তাই, আসুন আমরা সবাই ‘কমন সেন্স’ -এর চর্চা করি এবং একটি সুন্দর ও সহনশীল পরিবেশ গড়ে তুলি।