দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা, মলদ্বারে অস্বস্তি, ফোলা ভাব অথবা নিয়মিত রক্তপাত—এই লক্ষণগুলো অর্শের ইঙ্গিত হতে পারে। অনেকেই এই সমস্যাটিকে গুরুত্ব দেন না, ফলে রোগ ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। প্রাথমিক চিকিৎসাতেও যদি উপসর্গ না কমে, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে আধুনিক সার্জারি এখন অনেক কার্যকর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মলদ্বারের অ্যানাল ক্যানেলের ভিতরে অথবা বাইরে অর্শ হতে পারে। এর প্রধান লক্ষণ হলো মলদ্বার থেকে টাটকা রক্ত বের হওয়া। তবে রক্তপাতের সময় সাধারণত ব্যথা থাকে না।
অর্শ কেন হয়?
বিভিন্ন কারণে অর্শ হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
কোষ্ঠকাঠিন্য
দীর্ঘক্ষণ মল চেপে রাখার অভ্যাস
কম জল পান করা
সবুজ শাকসবজি কম খাওয়া
রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
অতিরিক্ত মানসিক চাপ
ফাস্ট ফুডে আসক্তি
ফাইবারযুক্ত খাবার না খাওয়া
দীর্ঘমেয়াদী ডায়রিয়া
অতিরিক্ত ওজন (ওবেসিটি)
গর্ভাবস্থা
পায়ুসঙ্গম
অর্শের লক্ষণ:
অর্শের কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যা দেখলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
মলত্যাগের সময় ব্যথাবিহীন রক্ত পড়া
প্রস্রাবের সঙ্গে অল্প রক্ত পড়া
মলদ্বারে চুলকানি এবং অস্বস্তিবোধ, ব্যথা হওয়া
মলদ্বারের চারপাশ ফুলে ওঠা
মলদ্বারে শক্ত মাংসপিণ্ড (লাম্প) অনুভব করা
অর্শ প্রধানত তিন ধরনের হতে পারে:
ইন্টারনাল অর্শ: এটি সাধারণত রেকটামের ভেতরের দিকে হয় এবং বাইরে থেকে দেখা যায় না। মলত্যাগের সময় অস্বস্তি ও রক্তপাত এর প্রধান লক্ষণ।
এক্সটার্নাল অর্শ: এটি মলদ্বারের বাইরের চামড়ার নিচে হয় এবং বাইরে থেকে সহজেই বোঝা যায়। মলদ্বারে চুলকানি ও রক্তপাত এর প্রধান উপসর্গ।
থ্রম্বোসড অর্শ: এক্ষেত্রে মলদ্বারের চারপাশে শক্ত মাংসপিণ্ড দেখা যায় এবং মলত্যাগের সময় জমাট রক্ত বের হতে পারে। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হতে পারে।
রোগ নির্ণয়:
অর্শ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক সাধারণত নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করেন:
ডিজিটাল রেকটাল এক্সামিনেশন: চিকিৎসক গ্লাভস পরে পায়ুদ্বারে আঙুল প্রবেশ করিয়ে কোনো অস্বাভাবিক গ্রোথ আছে কিনা তা পরীক্ষা করেন।
কোলোনোস্কোপি: অর্শ নিশ্চিত করার জন্য এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ জানার জন্য চিকিৎসক কোলোনোস্কোপি করার পরামর্শ দিতে পারেন।
চিকিৎসা ও সার্জারি:
অর্শের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসক সাধারণত ওষুধ দিয়ে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। তবে ওষুধে কাজ না হলে এবং অর্শ ক্রমশ বাড়তে থাকলে সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে অর্শের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন আধুনিক সার্জিক্যাল পদ্ধতি উপলব্ধ রয়েছে:
কেমিক্যাল কর্টারি বা থার্মো-কর্টারি: এই পদ্ধতিতে রোগাক্রান্ত স্থানটিকে অবশ করে পাইলস অপসারণ করা হয়। এতে রোগীকে অজ্ঞান করার প্রয়োজন হয় না এবং রোগী অপারেশনের পরের দিনই বাড়ি ফিরে যেতে পারেন।
Haemorrhoidectomy: এই পদ্ধতিতে রোগীকে জেনারেল অ্যানাস্থেসিয়া দিয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে পায়ুদ্বার উন্মুক্ত করে পাইলসটি কেটে বাদ দেওয়া হয়। তবে এই সার্জারির পর রোগ ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রায় ২০ শতাংশ থাকে।
Haemorrhoidal artery ligation: এই পদ্ধতিতে জেনারেল অ্যানাস্থেসিয়া করে হাইফ্রিকোয়েন্সি আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে পাইলসের রক্তনালীর রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে পাইলসটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়।
Stapling: এটি Haemorrhoidectomy-র বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে বৃহদান্ত্রের শেষ ভাগটি স্ট্যাপেল করা হয়, যার ফলে পাইলসের বৃদ্ধি প্রতিরোধ হয়। তবে এটি খুব কম ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।
অর্শের কষ্ট কমাতে:
কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি অবলম্বন করে অর্শের কষ্ট কমানো যেতে পারে:
নিয়মিত উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার, ফল, শাকসবজি ও দানা শস্য গ্রহণ করা।
মলদ্বারের চারপাশে লাগানোর জন্য ট্রপিক্যাল ক্রিম ব্যবহার করা।
দিনে দুবার অন্তত ১০-১৫ মিনিট গরম জলের ভাপ নেওয়া।
নিয়মিত স্নান করা ও মলদ্বার পরিষ্কার রাখা।
ফোলা কমানোর জন্য আইস ব্যাগ ব্যবহার করা।
প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা।
সতর্কতা:
অর্শের ঝুঁকি কমাতে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি:
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
মল চেপে না রাখা।
অতিরিক্ত তেল ও ঝালযুক্ত খাবার পরিহার করা।
নিয়মিত ফাইবার জাতীয় খাবার খাওয়া।
মলত্যাগের পর টিস্যু ব্যবহার না করে জল ব্যবহার করা।
নিয়মিত মলদ্বার পরিষ্কার রাখা।
মলের সঙ্গে সামান্য রক্ত পড়লেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
অর্শ অন্যান্য সাধারণ রোগের মতোই একটি রোগ। তাই অযথা লজ্জা না পেয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসা করানো উচিত। অভিজ্ঞ সার্জনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করালে অর্শের আধুনিক সার্জারি অত্যন্ত সফল হতে পারে।