গ্যাস্ট্রিকে ভুগছেন? গ্যাস্ট্রিক সম্পর্কে কিছু সাধারণ ধারণা যা আপনার আগে জানা ছিল না

গ্যাস্ট্রিকের মত সমস্যায় ভুগেনি এমন মানুষ খুবই কম দেখা যাবে। পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষই ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার খেতে খুব বেশি পছন্দ করে। যার দরুন তাদেরকে গ্যাস্ট্রিকের মত সমস্যায় বেশ কয়েকবার ভুগতে হয়। এই গ্যাস্ট্রিক প্রথমদিকে যেরকম খুব একটা সিরিয়াস থাকে না তেমনি যখন খুব বেশি সিরিয়াস হয়ে যায় তখন এর পরিণতি বেশ ভয়াবহ হয়। আর এই কারনেই গ্যাস্ট্রিককে সাধারণ সমস্যা না ভেবে গুরুত্বসহকারে নিতে হবে।

আজকে আলোচনা করা হবে গ্যাস্ট্রিকের সম্পর্কে। এ আর্টিকেলটিতে উল্লেখ করে দেওয়া হবে গ্যাস্ট্রিক প্রকৃতপক্ষে কি, কেন হয়, হলে করনীয়, কি করলে হবে না এবং রোধ করতে কি করা উচিত। তাই দেরি না করে চলুন আর্টিকেল এর মূল অংশে চলে যাওয়া যাক।

গ্যাস্ট্রিক কি?
গ্যাস্ট্রিক প্রকৃতপক্ষে পেটের একটি প্রদাহ। তবে এটি শুধু পাকস্থলীতে না হয়ে যেকোনো জায়গায় হতে পারে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পেপটিক আলসার বলা হলেও লোকমুখে এই সমস্যাটি গ্যাস্ট্রিক নামে পরিচিত।

গ্যাস্ট্রিক কেন হয়
গ্যাস্ট্রিক দেহের যে কোন অংশে হলেও সাধারণত পাকস্থলীতে এই সমস্যাটি বেশি দেখা যায়। কোন কারণে যদি পাকস্থলীতে অতিরিক্ত এসিড তৈরি হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিক হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। কেননা অতিরিক্ত এসিড পাকস্থলীর মিউকাস নামক পর্দাকে নষ্ট করে দেয়। মিউকাস নষ্ট করে দিয়ে অতঃপর তা পাকস্থলীর সংস্পর্শে এসে পেটে প্রদাহ তৈরি করে। এককথায় আমরা বলতে পারি পাকস্থলীতে অতিরিক্ত এসিড তৈরি হওয়ার কারণে যখন মিউকাস পর্দা নষ্ট হয়ে যাবে এবং সেই পর্দা নষ্ট হওয়ার পর এসিড পাকস্থলীর দেয়ালের সংস্পর্শে এসে যাবে তখন পাকস্থলীর দেয়ালগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে। এবং সেই অবস্থাকেই গ্যাস্ট্রিক বলা হয়।

তবে আরও একটি কারণে গ্যাস্ট্রিক হতে পারে। সেটি হচ্ছে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ। এই ক্ষেত্রে যেটা হয়, হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক একটি ব্যাকটেরিয়া মিউকাস পর্দা নষ্ট করে দেয়। আর এ কারণেই পাকস্থলীতে তৈরি হওয়া এসিডগুলো পাকস্থলীর দেয়ালের সংস্পর্শে এসে প্রদাহ তৈরি করে।

এ দুটি কারণ ছাড়াও বলা হয়ে থাকে যে জন্মগতভাবে যদি কারো পৌষ্টিকতন্ত্রের কোন ধরনের সমস্যা তথা গঠনগত কাঠামোতে দুর্বলতা থাকে তাহলেও সে ব্যক্তির পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক হতে পারে।

পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড বের হওয়ার কারণে গ্যাস্ট্রিক হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হওয়ার কারণ কি?

খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা ও পাকস্থলীতে কোন ত্রুটি জনিত কারণে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত এসিড তৈরি হতে পারে। এছাড়াও যে সকল কারণে পাকস্থলীতে এসিড তৈরি হয় সেগুলো হলো-

১) শরীরে যে কোন অঙ্গে ব্যথা করার কারণে সাথে সাথে ব্যথার ওষুধ খেয়ে ফেলা। অতিরিক্ত ব্যথার ওষুধ খাওয়া গ্যাস্ট্রিক হওয়ার কারণ। সুতরাং শরীরের কোন অঙ্গ প্রতঙ্গের ব্যথা হলেই যে ওষুধ খেয়ে ফেলতে হবে ব্যাপারটা এমন না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে ব্যথা নিজে থেকেই সেরে যায়।

২) আপনার যদি ঘুম না আসা কিংবা অনিদ্রা রোগ থেকে থাকে যেমন ইনসোমনিয়া। তাহলেও আপনার গ্যাস্ট্রিক হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেননা যদি রাতে ঠিকমতো ঘুম না হয় তখন পাকস্থলী থেকে অতিরিক্ত অ্যাসিড নির্গত হতে থাকে।

৩) এছাড়া অতিরিক্ত টেনশনের কারণে পাকস্থলী থেকে অতিমাত্রায় অ্যাসিড নির্গত হবার ঘটনা দেখা গিয়েছে। তাই বলা যায় যে, যারা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে কোন কিছু নিয়ে তাদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা প্রায়ই হয়।

৪) গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তথা পেটে অতিরিক্ত এসিড তৈরি হওয়ার প্রধান এবং মূল কারন হচ্ছে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাওয়া। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার সমস্যা তথা অভ্যাসের জন্য পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড নির্গত হয়। তাই বিশেষজ্ঞরা ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার কম খেতে বলেন।

৫) বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ধূমপান বা মদ্যপান গ্যাস্ট্রিক হওয়ার মূল কারণ। ধূমপান বা মদ্যপান এর কারণে যে শুধু গ্যাস্ট্রিক হয় তা না, শরীরের বিভিন্ন বড় বড় রোগগুলো এই দুটো কারণেই হয়ে থাকে। তাই যতটুকু সম্ভব ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করে সুখী জীবনযাপন করুন।

আপনার গ্যাস্ট্রিক হয়েছে কিনা কিভাবে বুঝবেন
অন্যান্য যে কোন সমস্যা বা রোগের জন্য যেমন কিছু সাধারণ উপসর্গ থাকে তেমনি গ্যাস্ট্রিকেরও সাধারণ কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। যে লক্ষণগুলো দিয়ে বুঝবেন আপনার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়েছে সেগুলো হলো-

১) পেটে প্রচুর পরিমাণে অস্বস্তি অনুভব হবে। যদিও গ্যাস্ট্রিক শুধু পাকস্থলী না, যে কোন জায়গায় হতে পারে। কিন্তু পেটে সর্বপ্রথম অস্বস্তি অনুভব হওয়াটা স্বাভাবিক। অতঃপর বুকে ব্যথা হতে পারে তথা পাকস্থলী থেকে জ্বালা যন্ত্রণা উপর দিকে উঠতে থাকবে।

২) বমি বমি ভাব হবে। গ্যাস্ট্রিক হলে মনে হয় যে খাবার ভালো মত হজম হয়নি এবং খাবার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। একই সাথে মাথা ঘুরানোর মতো সমস্যা দেখা দিবে বলে বমি বমি ভাব হবে। বেশ কয়েকবার বমিও হতে পারে।

৩) কোষ্ঠকাঠিন্যর মতো সমস্যা গ্যাস্ট্রিকের সময় দেখা যায়। তবে সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য না হয়ে নরম মল বেশি হয়।

৪) পেট ফেঁপে যাওয়া, গ্যাস্ট্রিকের একটি বড় উদাহরন। এ সময় দেখা যায় কোন খাবার না খাওয়া সত্বেও পেট ভরা ভরা লাগে। অনেকের ক্ষেত্রে পেট ফুলে যায়।

উক্ত লক্ষণগুলি যদি আপনার মধ্যে প্রকাশ পায় বুঝে নেবেন আপনার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়েছে।

গ্যাস্ট্রিক সম্পর্কিত দুটি ভুল ধারণার সঠিক ব্যাখ্যা হচ্ছে
ঝাল খেলে গ্যাস্ট্রিক হয় – এই কথার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বেশি জল খেলে গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধ হয় – এই কথারও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কেননা গ্যাস্ট্রিক হচ্ছে অ্যাসিড সংক্রান্ত বিষয়। সেখানে জলের সাথে কোন যোগ সূত্র নেই।

গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধ করতে যা যা করতে হবে
১) প্রতিদিন উষ্ণ গরম জল এর সাথে এক চা-চামচ মধু মিশিয়ে খেতে হবে

২) গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধে ধনেপাতা অনেক উপকারী। তাই তরকারিতে ধনেপাতা রাখা কিংবা আলাদা করে ধনে পাতার জুস খাওয়া যেতে পারে

৩) এক চামচ জোয়ান এর সাথে এক চিমটি লবণ মিশিয়ে খেলে গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধ হয়

৪) এছাড়াও গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধ করতে মৌরি অনেক ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে। সারা রাত ভিজিয়ে রাখার পর মৌরি জল পান করলে গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধ হয়

৫) বিভিন্ন উপকারী ব্যাকটেরিয়ার দই খেলে হজম শক্তি ভালো হয়। তাই খাবারের পর টক দই খেতে পারলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

সময়মতো গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসা করতে না পারলে যা যা হয়
১) পাকস্থলী ফুটো হয়ে যায়

২) বমির সাথে রক্ত বের হয়

৩) কালো মল বের হয়

৪) রক্তশূন্যতা দেখা যায়

৫) গ্যাস্ট্রিক থেকে পাকস্থলীর ক্যান্সার পর্যন্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে

৬) পৌষ্টিক নালীর পথ সরু হয়ে যায়

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy