বেশি ওজন মানেই কি মন খারাপ? ‘ইমোশনাল ইটিং’ অজান্তেই ঠেলে দিচ্ছে বিপদের দিকে!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের প্রতি আট জনের মধ্যে একজন স্থূলতার শিকার। কিন্তু অতিরিক্ত ওজনের এই লড়াইটা কেবল শরীরের নয়, মনেরও। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনার মতে, স্থূলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এটি একটি দ্বিমুখী রাস্তা— মানসিক চাপ থেকে ওজন বাড়ে, আবার ওজন বাড়লে বাড়ে মানসিক যন্ত্রণা।

বিষণ্ণতা ও ওজনের ‘দুষ্টচক্র’

অতিরিক্ত ওজনের কারণে অনেকেই হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সমাজের তৈরি করা ‘সৌন্দর্যের মানদণ্ডে’ নিজেকে অযোগ্য মনে করে অনেকে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। ডা. দিনা বলেন, “একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষকে আরও বেশি অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঠেলে দেয়। মন ভালো করতে চকলেট বা ফাস্টফুড খাওয়ার এই প্রবণতা ওজন আরও বাড়িয়ে দেয়।” এভাবেই তৈরি হয় এক দুর্ভেদ্য ‘ভিসিয়াস সাইকেল’ বা দুষ্টচক্র।

ইমোশনাল ইটিং: যখন খাবার হয় সান্ত্বনা

রাগ, দুঃখ বা একাকিত্ব ভুলতে একনাগাড়ে প্রচুর খেয়ে ফেলাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘বিঞ্জ ইটিং’ বা ‘ইমোশনাল ইটিং’ বলা হয়।

  • মানসিক চাপ: দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ শরীরে ‘কর্টিসল’ হরমোন বাড়ায়, যা চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আসক্তি তৈরি করে।

  • অপরাধবোধ: খাওয়ার পর তৈরি হওয়া অপরাধবোধ মানুষকে আরও হতাশ করে তোলে, যা পুনরায় বেশি খাওয়ার প্ররোচনা দেয়।

বডি ইমেজ ও আত্মসম্মান

বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে ‘বডি ডিসমরফিক ডিজঅর্ডার’ বা নিজের দেহ নিয়ে বিকৃত ভাবনা দেখা দেয়। নিজেকে ‘অসুন্দর’ মনে করা এবং চারপাশের মানুষের টিটকিরি বা উপহাস আত্মবিশ্বাসকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। এর ফলে দেখা দেয় তীব্র সামাজিক উদ্বেগ (Social Anxiety)।

নিদ্রাহীনতা ও ক্লান্তি

স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ বা ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্টের সমস্যা খুব সাধারণ। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় মেজাজ খিটখিটে হওয়া, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং সারাদিন অবসাদগ্রস্ত থাকা মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

মুক্তির পথ কী?

স্থূলতা কমাতে কেবল ডায়েট বা জিম যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানসিক চিকিৎসা। ডা. দিনার পরামর্শ:

  • সিবিটি থেরাপি: ‘কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি’ ইমোশনাল ইটিং নিয়ন্ত্রণে জাদুর মতো কাজ করে।

  • মাইন্ডফুলনেস: সচেতনভাবে খাবার গ্রহণ এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়ায়।

  • সামাজিক সমর্থন: পরিবার ও বন্ধুদের সহানুভূতিশীল মনোভাব রোগীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

বিশেষজ্ঞের টিপস: ওজন কমানোর লড়াইয়ে নিজের শরীরকে ঘৃণা করবেন না। বরং সুস্থ থাকার তাগিদে শরীরকে ভালোবাসতে শিখুন। নিয়মিত শরীরচর্চা কেবল ক্যালরি পোড়ায় না, মস্তিষ্কে ‘হ্যাপি হরমোন’ নিঃসরণ করে মনকেও ভালো রাখে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy