বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশ মানুষ নিয়মিত সুপারি সেবন করেন। এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশে এটি কেবল একটি সাধারণ চিবানোর দ্রব্য নয়, বরং ভালোবাসা, আতিথেয়তা এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার প্রতিকার হিসেবেও এর প্রচলন রয়েছে। কিন্তু জানেন কি, এই আপাত নিরীহ সুপারিই প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে? এর কার্যক্ষমতা এতটাই বেশি যে নিকোটিন, অ্যালকোহল এবং ক্যাফেইনের পাশাপাশি একেও ‘মতিবিভ্রমকারী মাদক’ (psychoactive substance) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাংস্কৃতিক প্রতীক থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি:
সুপারি, যা ‘এশিয়ার নীরব ঘাতক’ নামেও পরিচিত, কাঁচা, শুকনো অথবা পানপাতা দিয়ে মুড়িয়ে ‘খিলি’ বানিয়ে খাওয়া হয়। নারী ও শিশুসহ অনেকেই এটি ব্যবহার করলেও, দীর্ঘ সময় জেগে থাকার জন্য গাড়ি চালানো, মাছ ধরা বা নির্মাণকাজের মতো কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত কর্মক্ষম পুরুষদের মাঝেই সুপারির ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
তবে, সুপারি সেবনে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মুখের ক্যান্সারের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এমনকি প্রথমবার সুপারি ব্যবহার করার কয়েক দশক পরেও কারো মুখে ক্যান্সার হতে পারে, যা এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ।
তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা: সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা:
এশিয়ার যে কয়েকটি এলাকায় সুপারি খুব বেশি জনপ্রিয়, তার মধ্যে তাইওয়ান অন্যতম। সেখানে সুপারিকে ‘তাইওয়ানের চুইংগাম’ নামে অভিহিত করা হয়। একসময় এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। তবে, দেশের সরকার এখন কয়েক শতকের পুরনো এই অভ্যাসটি কমিয়ে আনতে এবং প্রতিবছর হাজার হাজার জীবন অকালে ঝরে পড়া থেকে রক্ষার জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলস্বরূপ, ২০১৩ সালে তাইওয়ানে সুপারি ব্যবহারকারী পুরুষের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমেছে।
তাইওয়ানের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের মুখের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হান লিয়াং-জুন উদ্বেগের সঙ্গে জানান, “অর্ধেক মানুষ এখনও জানেই না যে সুপারি মুখের ক্যান্সারের অন্যতম কারণ।” এই অজ্ঞতাই সচেতনতা বৃদ্ধির পথে এক বড় বাধা।
পানের খিলি ও ক্ষতিকর উপাদান:
এশিয়ার অনেক অঞ্চলে সুপারি স্থানীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি সাধারণত পানের খিলি বানিয়ে খাওয়া হয়, যার উপাদান বিভিন্ন দেশে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত চুন, পানপাতা, এলাচি বা দারচিনির মতো মশলা এবং তামাকের সাথে মিশিয়ে এই খিলি তৈরি করা হয়।
আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (International Agency for Research on Cancer – IARC) তাদের তালিকায় এসব উপাদানের মধ্যে এলাচ এবং দারচিনি ছাড়া বাকি সব উপাদানকে ‘ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান’ (carcinogenic) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিশেষ করে, ‘চুন’কে একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, কারণ এটি ব্যবহারের ফলে মুখের ভেতরে ছোট ছোট অনেক ক্ষত তৈরি হতে পারে। এই ক্ষতগুলির মাধ্যমেই ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানগুলি ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সুপারির এই লুকানো বিপদ সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। কারণ, বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ধারণ করলেও, এটি মানব স্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।