শরীরে উচ্চ কোলেস্টেরল নীরবে ডেকে আনছে বিপদ, সতর্ক হন আজই

শরীরে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। দিনের পর দিন খারাপ কোলেস্টেরল রক্তনালীর দেওয়ালে জমা হয়ে প্লেক তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে ধমনীগুলোকে সংকীর্ণ করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে রক্তপ্রবাহ কঠিন হয়ে পড়ে এবং একটা সময় কোলেস্টেরলের স্তর পুরু হয়ে মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বংশে উচ্চ কোলেস্টেরলের ইতিহাস থাকলে অন্যদেরও এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত ওজন এই ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়লেও সাধারণত এর তেমন কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু সম্প্রতি বিশেষজ্ঞরা পায়ের একটি বিশেষ লক্ষণকে উচ্চ কোলেস্টেরলের সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, পায়ের রঙের পরিবর্তন হতে শুরু করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু না করলে ‘এথেরোস্ক্লেরোসিস’ নামক একটি মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে চর্বি, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য পদার্থ ধমনীর দেওয়ালে জমা হয়ে প্লেক তৈরি করে। এই প্লেক ধমনীকে সংকুচিত করে রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, যা বিশেষত পা সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এমনকি, এই প্লেক ভেঙে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

পায়ে রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ‘পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ’ (পিএডি)-এর ঝুঁকি বাড়ে। পিএডি হলো প্লাক তৈরির কারণে ধমনী সরু হয়ে যাওয়ার একটি অবস্থা, যার ফলে হাত ও পায়ে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। পিএডি-তে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত হাঁটার সময় পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন, যা ‘ক্লাউডিকশন’ নামে পরিচিত। সময় মতো চিকিৎসা না করালে এটি গুরুতর ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইসকেমিয়া’ এবং ‘তীব্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইসকেমিয়া’র মতো মারাত্মক রূপ নিতে পারে, যেখানে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পায়ের রং বদলায় কেন?

পিএডি-র কারণে যখন পায়ে রক্ত প্রবাহ কমে যায়, তখন পায়ের স্বাভাবিক রঙ পরিবর্তিত হতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লক্ষণটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। সময় মতো শনাক্ত করতে না পারলে পা ফ্যাকাশে বা নীলাভ হয়ে যেতে পারে। পায়ে রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার কারণেই এমনটা ঘটে। এছাড়াও, হাঁটার সময় পায়ে ব্যথা অনুভব হতে পারে, যা কয়েক মিনিটের বিশ্রামের পর কিছুটা কমতে পারে।

পিএডি-র অন্যান্য লক্ষণ:

নীচের পা বা পায়ে ঠান্ডা অনুভূতি, অসাড়তা ও দুর্বলতা।
পা বা পায়ের স্পন্দন দুর্বল হয়ে যাওয়া।
হাঁটা বা সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো কাজ করার পর নিতম্ব বা উরুর পেশিতে টান লাগা।
পায়ের নখের বৃদ্ধি কমে যাওয়া।
পায়ের আঙুল বা পায়ে ঘা হওয়া এবং ক্ষত দেরিতে সারতে শুরু করা।
হাত দিয়ে কাজ করার সময় ব্যথা বা টান অনুভব করা।
পুরুষদের ক্ষেত্রে ইরেক্টাইল ডিসফাংশন।
পায়ে চুল কমে যাওয়া বা চুলের বৃদ্ধি ধীর হয়ে যাওয়া।
শনাক্ত করার উপায়:

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে উচ্চ কোলেস্টেরলের উপস্থিতি সহজেই শনাক্ত করা যায়। এই পরীক্ষা ‘লিপিড প্রোফাইল’ বা ‘লিপিড প্যানেল’ নামে পরিচিত। পরীক্ষার আগে রোগীকে সাধারণত ৮-১২ ঘণ্টা খালি পেটে থাকার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের উপায়:

সুস্থ জীবনযাপন কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রধান উপায়।
নিয়মিত পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ করুন।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত ব্যায়াম করা জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন।
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে তা নীরবে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাই পায়ের রঙের পরিবর্তন সহ অন্যান্য লক্ষণগুলি নজরে রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতাই পারে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে।