মাসিকের সময় অসহ্য যন্ত্রণা? হতে পারে এন্ডোমেট্রিওসিস! জানুন উপসর্গ ও চিকিৎসা

এন্ডোমেট্রিয়াম হলো জরায়ুর ভেতরের স্তর, যা প্রতি মাসে মাসিকের সময় রক্তপাতের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এই স্তরটি দুটি প্রধান হরমোন, ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের প্রভাবে বিশেষভাবে সংবেদনশীল থাকে। তবে কিছু নারীর ক্ষেত্রে এই এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু জরায়ুর বাইরে, যেমন ডিম্বনালি, ডিম্বাশয় বা অন্য কোনো পেলভিক অঞ্চলে জন্মাতে শুরু করে। এই অবস্থার নাম এন্ডোমেট্রিওসিস। এর ফলে মাসিকের সময় জরায়ুর পাশাপাশি ওই স্থানগুলোতেও রক্তপাত ও তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়, যা একজন নারীর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রধান উপসর্গগুলো:
মাসিকের সময় পেটে তীব্র ও অসহ্য ব্যথা। অনেকের ক্ষেত্রে মাসিকের সময় ছাড়াও পেটে একটানা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
যৌন মিলনের সময় ব্যথা অনুভব করা।
মাসিকের সময় অস্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ অথবা দীর্ঘ সময় ধরে রক্তপাত হওয়া।
বন্ধ্যত্বের সমস্যা দেখা দেওয়া।
মূত্রত্যাগ ও মলত্যাগের সময় ব্যথা অনুভব করা।
মাসিক চলাকালীন দুর্বলতা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং বমি বমি ভাব অনুভব করা।
কেন হয় এই রোগ?
ডিম্বনালি, ডিম্বাশয় বা জরায়ুর অন্য কোনো স্থানে এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু কীভাবে বিস্তার লাভ করে, তার কিছু সম্ভাব্য কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
রেট্রোগ্রেড মেনস্ট্রুয়েশন: মাসিকের রক্ত যখন শরীরের বাইরে প্রবাহিত না হয়ে ডিম্বনালি বা ডিম্বাশয়ের দিকে বিপরীত গতিতে ফিরে আসে, তখন সেখানে এন্ডোমেট্রিয়াল কোষ জন্মাতে শুরু করে।
সার্জিক্যাল ইমপ্লান্টেশন: সিজারিয়ান সেকশন বা হিস্টারোস্কোপির মতো অস্ত্রোপচারের সময় এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে সেখানে বৃদ্ধি পেতে পারে।
পেরিটোনিয়াল মেটাপ্লাসিয়া: কিছু রোগ প্রতিরোধ সংক্রান্ত জটিলতা বা হরমোনগত কারণে পেরিটোনিয়াল কোষ এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যুতে রূপান্তরিত হতে পারে।
লিম্ফ্যাটিক বা রক্তনালীর মাধ্যমে বিস্তার: এন্ডোমেট্রিয়াল কোষ রক্ত বা লসিকার মাধ্যমে শরীরের অন্য অঙ্গেও পৌঁছাতে পারে।
এমব্রায়োনিক সেল মেটাপ্লাসিয়া: বয়ঃসন্ধিকালে ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে এন্ড্রাজোনিক কোষ এন্ডোমেট্রিয়াল কোষে রূপান্তরিত হতে পারে।
কিছু ঝুঁকির কারণও এন্ডোমেট্রিওসিসের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। যেমন, পরিবারে মা বা বোনের এই রোগ থাকলে, ৩০ বছর বয়সের পর প্রথম সন্তানের জন্ম দিলে, জরায়ুতে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা থাকলে, স্বাভাবিক সময়ের আগে বারবার মাসিক শুরু হলে, মাসিক দীর্ঘ দিন ধরে চললে অথবা মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
রোগ শনাক্তকরণ:
এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে রোগীর সম্পূর্ণ রোগের ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও, রোগ নিশ্চিতকরণের জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে, যেমন—আলট্রাসাউন্ড, এমআরআই এবং বায়োপসি।
চিকিৎসা পদ্ধতি:
এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে, যা রোগীর উপসর্গ ও রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে:
ব্যথানাশক ওষুধ: মাসিকের সময় ব্যথা কমাতে সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।
হরমোন থেরাপি: হরমোন থেরাপি ব্যথা কমাতে, মাসিক নিয়মিত করতে এবং মাসিকের রক্তপ্রবাহ কমাতে ব্যবহার করা হয়। হরমোনের ওষুধগুলো এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যুর বৃদ্ধি বন্ধ করতে এবং নতুন টিস্যু তৈরি হতে বাধা দিতে পারে।
অস্ত্রোপচার: অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ুর বাইরে জন্মানো এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু বাদ দেওয়া হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে জরায়ু, ডিম্বাশয় ও ডিম্বনালী (ফেলোপিয়ান টিউব) অপসারণের প্রয়োজনও হতে পারে।
মাসিকের সময় অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করলে বা উপরে উল্লেখিত অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিওসিসের কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।