মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছেন? উচ্চ রক্তচাপের মতো নিম্ন রক্তচাপও কেড়ে নিতে পারে প্রাণ!

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার নিয়ে আমাদের সমাজে যতখানি আতঙ্ক ও সচেতনতা দেখা যায়, নিম্ন রক্তচাপ বা লো প্রেশার (Hypotension) নিয়ে মানুষের সচেতনতা তার সিকিভাগও নেই। বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন লো প্রেশার মানে কেবল একটু দুর্বলতা বা ক্লান্তি, যা জল বা নুন-চিনি খেলেই ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক কার্ডিওলজিক্যাল গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। চিকিৎসকদের মতে, রক্তচাপ যদি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় কমে যায়, তবে তা উচ্চ রক্তচাপের মতোই সমানভাবে বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী হতে পারে।
রক্তচাপ বলতে রক্তনালীর প্রাচীরের ওপর রক্তের প্রবাহজনিত চাপকে বোঝায়। স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে রক্তচাপের আদর্শ মাত্রা হলো ১২০/৮০ মিলিমিটার পারদ। কিন্তু এই মাত্রা যদি ৯০/৬০ মিলিমিটার পারদ বা তার নিচে নেমে যায়, তবে তাকে হাইপোটেনশন বা নিম্ন রক্তচাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ফলে মস্তিষ্কে, হৃদপিণ্ডে এবং কিডনির মতো প্রধান প্রধান অঙ্গগুলিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর ফলে কোষে কোষে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়, যা শরীরকে সাময়িকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা অজ্ঞান করে দিতে পারে।
লো প্রেশারের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত মাথা ঘোরানো, চোখে অন্ধকার দেখা, শরীর হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া, মনোযোগের অভাব, ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে ত্বক এবং অতিরিক্ত ঘাম হওয়া। অনেক সময় পরিস্থিতি এত দ্রুত অবনতি ঘটে যে রোগী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় সিনকোপ (Syncope) বলা হয়। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ধরনের আকস্মিক রক্তচাপ পতন মারাত্মক আঘাত বা ফ্র্যাকচারের কারণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে লো প্রেশার থাকলে কিডনি ফেইলিওর এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
লো প্রেশারের সমস্যা থেকে নিরাপদ থাকতে এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে জল, ডাবের জল, ফলের রস বা নুন-চিনির জল পান করতে হবে। ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা লো প্রেশার তৈরির অন্যতম প্রধান অনুঘটক। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে না থেকে অল্প অল্প করে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। খাবারে সোডিয়াম বা লবণের পরিমাণ সামান্য বাড়াতে পারেন, তবে তা যেন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হয়। তৃতীয়ত, হঠাৎ করে বিছানা বা চেয়ার থেকে ওঠার সময় তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে উঠুন, যাতে রক্তপ্রবাহ সঠিকভাবে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারে। চতুর্থত, রক্ত সঞ্চালন সচল রাখতে এবং পেশির শক্তি বাড়াতে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যদি প্রায়শই আপনার লো প্রেশারজনিত সমস্যা দেখা দেয়, তবে অবহেলা না করে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। সচেতনতাই পারে আপনাকে এই নীরব ঘাতক সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে।