সাধারণত আমরা যেটাকে গ্যাস্ট্রিক বা আলসার বলে চিনি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তার প্রকৃত নাম হলো পেপটিক আলসার। এটি পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ (ডিওডেনাম) বা খাদ্যনালীর নিম্নভাগে সৃষ্ট এক ধরনের ক্ষত। এই রোগটি অনেকের কাছেই একটি সাধারণ সমস্যা মনে হলেও, এর কারণ, লক্ষণ এবং সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান থাকা জরুরি, কারণ সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
পেপটিক আলসার কেন হয়?
পেপটিক আলসার সৃষ্টির পেছনে বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান। প্রধানত, পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হওয়াই এই সমস্যার মূল কারণ। অতিরিক্ত অ্যাসিড পাকস্থলীর ভেতরের সুরক্ষামূলক স্তর ‘মিউকোসা’কে নষ্ট করে দেয় এবং সরাসরি পাকস্থলীর সংস্পর্শে এসে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
এছাড়াও, ‘হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি’ (Helicobacter pylori) নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই মিউকোসাল পর্দাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে অ্যাসিডকে পাকস্থলীর সংস্পর্শে আসতে সাহায্য করে, যা প্রদাহের জন্ম দেয়। কারও পৌষ্টিকতন্ত্র থেকে যদি বেশি পরিমাণে অ্যাসিড এবং প্রোটিন পরিপাককারী এনজাইম (পেপসিন) নিঃসৃত হতে থাকে, তাহলেও পেপটিক আলসার হতে পারে। জন্মগতভাবে পৌষ্টিকতন্ত্রের গঠনগত কাঠামো দুর্বল থাকলেও পেপটিক আলসারের ঝুঁকি থাকে।
পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরির কারণসমূহ:
ব্যথানাশক ওষুধ: অ্যাসপিরিন বা NSAID-এর মতো কিছু ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘমেয়াদী সেবনে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হতে পারে।
অনিদ্রা ও অতিরিক্ত টেনশন: মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।
বেশি তেলে ভাজাপোড়া খাবার: ফাস্ট ফুড এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার হজমে সমস্যা করে এবং অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়ায়।
ধূমপান: ধূমপান পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়ায় এবং আলসার নিরাময়ে বাধা দেয়।
মদ্যপান: মদ্যপান পাকস্থলীর আস্তরণের ক্ষতি করে আলসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
লক্ষণ দেখে বুঝবেন কীভাবে?
পেপটিক আলসারের কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যা দেখে রোগটি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা যেতে পারে:
পেটের উপরিভাগে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া (বিশেষত নাভির উপরের অংশে)।
খাওয়ার ঠিক পরপর ব্যথা বেড়ে যাওয়া (এটি গ্যাস্ট্রিক আলসারের লক্ষণ হতে পারে)।
খালি পেটে ব্যথা বেড়ে যাওয়া (এটি ডিওডেনাল আলসারের লক্ষণ হতে পারে)।
ঘন ঘন ঢেঁকুর ওঠা।
বদহজম বা অস্বস্তি অনুভব করা।
বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
প্রতিরোধ ও চিকিৎসা:
প্রতিরোধ: পেপটিক আলসার প্রতিরোধে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি:
নিয়মিত খাবার: সময় মতো খাবার খান এবং খাবার বর্জন করা থেকে বিরত থাকুন।
ভাজাপোড়া পরিহার: অতিরিক্ত তেল, চর্বিযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলুন।
দুশ্চিন্তা পরিহার: মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা কমানোর চেষ্টা করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
ধূমপান ও মদ্যপান বন্ধ: ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
ব্যথানাশক ওষুধ এড়ানো: অ্যাসপিরিন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকুন।
চিকিৎসা: পেপটিক আলসারের রোগীরা সাধারণত অ্যান্টাসিড এবং এজাতীয় ওষুধ খেলে উপকৃত হন। যদি জীবাণু (যেমন হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি) জনিত কারণে এই রোগ হয়ে থাকে, তবে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য ওষুধের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তবে, দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ সেবনের পরও যদি রোগী ভালো না হন, বা কিছু খেলে বমি হয়ে যায় (যা পৌষ্টিক নালির কোনো অংশ সরু হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়), সে ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে রোগী উপকৃত হতে পারেন।
সময়মতো চিকিৎসা না করালে কী হতে পারে?
পেপটিক আলসারের সময়মতো চিকিৎসা না করালে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে:
পাকস্থলী ফুটো হয়ে যাওয়া (Perforation): সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
রক্তবমি: পাকস্থলী বা ডিওডেনামের ক্ষত থেকে রক্তপাত হলে রক্তবমি হতে পারে।
কালো পায়খানা: হজমকৃত রক্ত পায়খানার সাথে মিশে কালো পায়খানা হতে পারে।
রক্তশূন্যতা: দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাতের কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
ক্যানসার: কদাচিৎ, দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল আলসার থেকে ক্যানসারও হতে পারে।
পৌষ্টিক নালির পথ সরু হওয়া (Stricture): ক্ষত নিরাময়ের সময় টিস্যু জমে পৌষ্টিকনালীর পথ সরু হয়ে যেতে পারে, ফলে রোগীর বারবার বমি হতে পারে।
কিছু প্রচলিত ধারণা ও চিকিৎসকের পরামর্শ:
ঝাল খেলে কি পেপটিক আলসার হয়? চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি। ঝাল আলসারের কারণ না হলেও, আলসার থাকলে ব্যথা বাড়াতে পারে।
বেশি বেশি জল পান করলে কি পেপটিক আলসার ভালো হয়ে যায়? বেশি জল পান করলে এই রোগ হবে না বা ভালো হয়ে যায় এমন কোনো কথা নেই; বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। পরিমিত জল পান করাই ভালো।
হঠাৎ বা গভীর রাতে পেটে ব্যথার কারণে রোগীর ঘুম ভেঙে গেলে কী করবেন? কিছু খেলে ব্যথা কমে যায় বা অ্যান্টাসিড সিরাপ খুব ভালো কাজ দেয়। সমস্যা বেশি হলে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
কাজেই, যারা দীর্ঘমেয়াদী পেপটিক আলসারে ভুগছেন, তাদের উচিত দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, পেপটিক আলসারজনিত জটিলতা আগে থেকেই শনাক্ত করা এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হোন এবং কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।