পেটের অস্বস্তিকর সমস্যা আইবিএস: কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত

পেটের সমস্যায় আমরা অনেকেই ভুগে থাকি। কোনো কোনো সময় এই পেটের পীড়া এতটাই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে যে, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। এই অবস্থাকেই আইবিএস (IBS) বলা হয়, যার পূর্ণরূপ হলো ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (Irritable Bowel Syndrome)। সিনড্রোম অর্থ হলো একটি রোগের বিভিন্ন উপসর্গ বা লক্ষণের সমষ্টি। আইবিএসকে তাই পেটের কয়েকটি উপসর্গের সমন্বয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এ রোগে পেট স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি স্পর্শকাতর ও ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রতি ১০ জনে অন্তত একজন মানুষ তার জীবদ্দশায় এ রোগে আক্রান্ত হন। নাটোরের একটি গ্রামে পরিচালিত সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতি ১০০ জন পুরুষের মধ্যে ২০.৬ জন এবং ১০০ জন নারীর মধ্যে ২৭.৭ জন এই রোগে আক্রান্ত হন।

অস্বস্তিকর এই পেটের পীড়ার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক সুসেন কুমার সাহা।

কেন হয় আইবিএস?
অধ্যাপক সুসেন কুমার সাহা জানান, আজ পর্যন্ত এই রোগের প্রকৃত কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। অনেক কারণে এ রোগ হতে পারে বলে চিকিৎসার অন্তর্নিহিত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত কেবল উপসর্গের চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে ভালো রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন কারণের মধ্যে রয়েছে:

খাদ্যনালির অতি সংবেদনশীলতা: এটি অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
পরিপাকতন্ত্রের নাড়াচাড়ার অস্বাভাবিকতা: অন্ত্রের গতিশীলতায় সমস্যা।
অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে পাঠানো বার্তায় ত্রুটি: স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদানে সমস্যা।
স্নায়ুর চাপ এবং দুশ্চিন্তা: মানসিক চাপ আইবিএস-এর লক্ষণগুলোকে বাড়িয়ে তোলে।
খাদ্যাভ্যাস: নির্দিষ্ট কিছু খাবার আইবিএস-এর উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।
অন্ত্রের প্রদাহ এবং সংক্রমণ: অতীতের সংক্রমণ বা প্রদাহ আইবিএস-এর কারণ হতে পারে।
হরমোন: নারীদের মাসিকচক্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক দেখা যায়।
মাদক গ্রহণ, বংশগত কারণ, পেটের যেকোনো অপারেশন ও দীর্ঘকাল ধরে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন: এগুলোও আইবিএস-এর সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
আইবিএস-এর প্রধান উপসর্গগুলো কী কী?
আইবিএস শনাক্ত করতে হলে অন্তত দুটি লক্ষণ তিন মাস পর্যন্ত উপস্থিত থাকতে হবে। প্রধান উপসর্গগুলো হলো:

পেটব্যথা
পেটফাঁপা
পায়খানার সঙ্গে আম যাওয়া
ডায়রিয়া
কোষ্ঠকাঠিন্য
ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমন্বয় (অর্থাৎ কখনো ডায়রিয়া, কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য)
এছাড়া অন্যান্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

পেটে অত্যধিক গ্যাস ও অত্যধিক শব্দ
বুক জ্বালা ও বদহজম
পায়খানা সম্পূর্ণ না হওয়া
পেটে ব্যথা হলে টয়লেটে যাওয়ার খুব তাড়া
পেটব্যথা হলে পাতলা পায়খানা হওয়া
শারীরিক অবসাদ ও দুর্বলতা, মাথাব্যথা, পিঠে ব্যথা, কোমরে ব্যথা
ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চলাকালীন কিংবা মিলনের সময় ব্যথা
সতর্কীকরণ:
যদি পায়খানার সঙ্গে রক্ত পড়ে, শরীরের ওজন কমে যায় এবং হঠাৎ পায়খানার ঘনত্বের পরিমাণ কমে যায়, তবে এগুলো অন্য কোনো রোগের এমনকি কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের উপসর্গও হতে পারে। এ অবস্থায় অতিসত্বর কোনো গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
অধ্যাপক সুসেন কুমার সাহা জানান, আইবিএস সাধারণত উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা হয়। রোগীর বয়স ও সুনির্দিষ্ট লক্ষণের ওপর নির্ভর করে এক বা একাধিক পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। ৪০ বছরের কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে লক্ষণের ওপর নির্ভর করে রোগ শনাক্ত করা যায়। ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে, যেমন: রক্ত পরীক্ষা, মল পরীক্ষা, পেটের এক্স-রে, বেরিয়াম এনেমা, প্রক্টোসিগময়ডোস্কপি/কলোনোস্কপি। তবে আইবিএস রোগীর ক্ষেত্রে এসব পরীক্ষার ফলাফল সাধারণত স্বাভাবিক থাকে।

চিকিৎসা পদ্ধতি:
অধ্যাপক সাহা জোর দিয়ে বলেন, আইবিএস ঝুঁকিপূর্ণ রোগ নয়, সংক্রামক রোগও নয়, এমনকি বংশগত রোগও নয়। এটি অন্ত্রের ক্যান্সার কিংবা অন্য কোনো ক্যান্সারের কারণও নয়। এই বিষয়গুলো রোগীর চিকিৎসা শুরুর আগে তাকে ভালো করে বোঝানো জরুরি।

বর্তমানে আইবিএস-এর চিকিৎসা উপসর্গভিত্তিক। ডায়রিয়াপ্রবণ আইবিএস (IBS-D), কোষ্ঠকাঠিন্যপ্রবণ আইবিএস (IBS-C) ও উভয় লক্ষণ থাকলে (IBS-M) সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। আইবিএস চিকিৎসায় কোনো একক ওষুধ সম্পূর্ণরূপে কার্যকরী নয়।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: দুধ ও দুধজাতীয় খাবার অনেক রোগীর উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়, তাই সেগুলো পরিহার করা উচিত। কোন খাবারগুলো আপনার উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়, তা লক্ষ্য করে সেগুলো বাদ দিন।
মানসিক চাপ কমানো: মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে পারেন অথবা মনকে আনন্দ ও প্রশান্তি দিতে পারে এমন কিছু করতে পারেন। রিলাক্সেশন থেরাপির মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানো যেতে পারে।
ওষুধ:
ডায়রিয়াপ্রবণ আইবিএস (IBS-D)-এর ক্ষেত্রে: লোপেরামাইড, ডাইফেনোঅক্সালেট, অক্সিফেনোনিয়াম প্রভৃতি ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা অন্ত্রের নাড়াচাড়া কমানোর মাধ্যমে কাজ করে।
কোষ্ঠকাঠিন্যপ্রবণ আইবিএস (IBS-C)-এর ক্ষেত্রে: বিভিন্ন ধরনের ল্যাক্সেটিভ-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ইসবগুলের ভুসি ও অন্যান্য আঁশ এক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
পেটে ব্যথা: যেসব রোগীর ক্ষেত্রে পেটে ব্যথা আইবিএস-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপসর্গ, সেখানে অ্যান্টিস্পাসমোডিক্স-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা অন্ত্রের সংকোচন কমানোর মাধ্যমে কাজ করে।