‘কার এত জ্বালা উঠছে?’ সাংবাদিককে আক্রমণ করতেই আসরে নামল টিআইবি! বড় বিপাকে মন্ত্রী?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক এবং সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর আক্রমণাত্মক ও অসৌজন্যমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশের বিশিষ্ট সুশীল সমাজ ও দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সাম্প্রতিক একটি সংবাদ সম্মেলনে সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে প্রতিমন্ত্রী যেভাবে সংবাদকর্মীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং পাল্টা আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন, তাকে স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাকস্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের অধিকার খর্ব করার একটি অত্যন্ত আত্মঘাতী ও লজ্জাজনক প্রয়াস বলে অভিহিত করেছে সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক জোরালো ও আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, টেকনোক্র্যাট কোটায় শপথ নেওয়া দ্বৈত নাগরিকত্বধারীর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে অসাংবিধানিক ও সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। শৈশব থেকে যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা এবং সে দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন কবির দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব আইনগতভাবে ত্যাগ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। এই বিষয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজের প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট না করে উল্টো প্রশ্নকর্তা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে আপত্তিকর মন্তব্য করার মাধ্যমে তিনি নিজেই নিজের রাষ্ট্রীয় পদকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার, যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত একটি নিয়মিত ব্রিফিং চলাকালীন সাংবাদিকেরা প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্ব ও তার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সেই ন্যায্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি কোনো আইনি বা তথ্যভিত্তিক জবাব না দিয়ে প্রতিমন্ত্রী উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘‘কে এটা নিউজ করেছে? কার এত জ্বালা যে মানে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ? তো তার জ্বালা কেন হচ্ছে? তার কি ২০০৮-এর জ্বালা উঠছে নাকি আবার? মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের জ্বালা উঠছে তার আবার? নাকি?’’ প্রতিমন্ত্রীর এই ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক আচরণ গণমাধ্যম মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
টিআইবি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছে যে, সংবাদটি কে প্রকাশ করেছে বা কোন সংবাদকর্মী প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন, তা এখানে কখনোই মূল বিষয় হতে পারে না। মূল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পবিত্র মুহূর্তে তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব আদৌ বহাল ছিল কি না। এমন একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি ও যৌক্তিক উত্তর দেওয়া সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিমন্ত্রীর প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। একজন মন্ত্রীর এহেন আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করতে পারে এবং সংবাদকর্মীদের মনে একধরনের ভীতি বা ‘চিলিং ইফেক্ট’ তৈরির আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পরিশেষে, বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং সাংবিধানিক সুশাসন বজায় রাখতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবিলম্বে সঠিক তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার জোরালো দাবি জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে, সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রী বা সমমর্যাদার দায়িত্বশীল ব্যক্তির যদি এ ধরনের দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন থাকে, তবে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে তাদের ক্ষেত্রেও প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের জন্য এটি এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিব্রতকর বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।