‘১০০ শতাংশ খাঁটি আটা’ দাবি ঘিরেই যত বিতর্ক! ITC-র লাইসেন্স বাতিল নিয়ে যা জানাল আদালত!

দেশজুড়ে ভেজাল খাদ্যপণ্য এবং বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের রমরমা রোধে একাধিক রাজ্যের সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি যখন অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক এফএমসিজি সংস্থা আইটিসি লিমিটেডের (ITC Limited) জনপ্রিয় পণ্য ‘আশীর্বাদ আটা’ এবং আদানি উইলমার গ্রুপের ‘ফরচুন’ সয়াবিন তেলকে ঘিরে চরম আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। পণ্যের প্যাকেজিংয়ে থাকা ‘১০০ শতাংশ খাঁটি’ বা ‘কোলেস্টেরল মুক্ত’ দাবির সত্যতা নিয়ে দেশটির খাদ্য সুরক্ষা এবং গুণমান যাচাইকারী শীর্ষ সংস্থা এফএসএসএআই (FSSAI)-এর পাঠানো কড়া নোটিসের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমে আপাতত বড় ধরনের স্বস্তি পেল আইটিসি। দিল্লির উচ্চ আদালত এই মামলার শুনানিতে অন্তর্বর্তীকালীন রক্ষাকবচ প্রদান করায় এখনই বহুজাতিক সংস্থাটির ফুড লাইসেন্স বা খাদ্য লাইসেন্স বাতিল হচ্ছে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পুরো এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় মূলত চলতি বছরের মে মাস নাগাদ। আইটিসি লিমিটেডের অত্যন্ত জনপ্রিয় পণ্য ‘আশীর্বাদ এমপি চাক্কি আটা’র প্যাকেটের গায়ে এবং বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে জোরালোভাবে দাবি করা হতো যে এই আটা ১০০ শতাংশ খাঁটি, এতে ১০০ শতাংশ মধ্যপ্রদেশের গম ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর মধ্যে বিন্দুমাত্র ময়দা বা অন্য কোনো ভেজাল নেই—অর্থাৎ ‘০ শতাংশ ময়দা’। কিন্তু এফএসএসএআই-এর গুণমান পরীক্ষা ও মূল্যায়নে এই দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্পষ্ট যুক্তি ছিল যে, প্যাকেটের গায়ে লেখা এই ধরনের পরম বা চরম দাবিগুলি অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করতে পারে। এর পরেই গত মে মাসে এফএসএসএআই-এর তরফে একটি নির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করে সংস্থাকে তাদের পণ্যের প্যাকেট এবং সমস্ত প্রচার মাধ্যম থেকে ‘১০০ শতাংশ’ বা ওই জাতীয় অতিরঞ্জিত শব্দবন্ধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর না করায় চলতি বছরের আগস্ট মাসের ১০ তারিখে আইটিসিকে একটি শো-কজ নোটিস পাঠানো হয়।

সংস্থাকে তাদের জবাব দেওয়ার জন্য ৩০ দিনের আইনি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কলকাতা থেকে একটি ইমপ্রুভমেন্ট নোটিস এসে পৌঁছায়। সেই নোটিসে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, প্যাকেটে লেখা ‘100% Atta’, ‘100% Madhya Pradesh Wheat’ এবং ‘0% Maida’ শব্দগুলি কেন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ১৫ দিনের মধ্যে দিতে হবে। অন্যথায় সংস্থার ফুড লাইসেন্স বা খাদ্য সংক্রান্ত অনুমোদন স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

এই নির্বিচার ও কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইটিসি লিমিটেড সরাসরি দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। কোম্পানির আইনি দল আদালতে যুক্তি দেখায় যে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই এবং কোনো সুনির্দিষ্ট ও পোক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অনুপস্থিতিতে শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক নির্দেশিকা জারি করে এমন সর্বাত্মক বিধিনিষেধ আরোপ করা যায় না। পাশাপাশি, এফএসএসএআই-এর পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে পুরো মামলাটির ক্ষেত্রে দিল্লির এখতিয়ার রয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কারণ মূল বিষয়টি মূলত কলকাতা থেকে উত্থাপিত হয়েছিল।

উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর দিল্লি হাইকোর্টের বিশিষ্ট বিচারপতি স্বর্ণকান্ত শর্মার বেঞ্চ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রায় প্রদান করে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী ৯ সেপ্টেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে এবং ততদিন পর্যন্ত আইটিসি-র ফুড লাইসেন্স বাতিল করা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত বা কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। অর্থাৎ, পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত বহুজাতিক সংস্থাটি আদালতের তরফ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন আইনি সুরক্ষা ভোগ করবে।

উল্লেখ্য, এই বিতর্ক কেবল একা আইটিসি বা আশীর্বাদ আটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোজ্যতেল প্রস্তুতকারক সংস্থা আদানি উইলমার লিমিটেডের (AWL Agri Business) জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘ফরচুন’ সয়াবিন তেলকেও কাঠগড়ায় তুলেছে এফএসএসএআই। ‘Fortune Soya Health Refined Soyabean Oil’-এর বোতল বা প্যাকেটের গায়ে বড় বড় অক্ষরে মুদ্রিত ‘100% Veg’ এবং ‘Cholesterol Free-For Healthy Lifestyle’ জাতীয় বিভ্রান্তিকর স্লোগান ও লেখা অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাদেরও কঠোর নোটিস ধরানো হয়েছে। সব মিলিয়ে, খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনে অতিরিক্ত বিপণন কৌশল এবং ভুয়া দাবির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার এই কড়া মনোভাব আগামী দিনে দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে এক বিরাট পরিবর্তন আনতে পারে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।