প্রজাপতির মতো দেখতে থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের শরীরের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্বরযন্ত্রের দু’পাশে অবস্থিত এই ক্ষুদ্র গ্রন্থিটি থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন করে, যা শরীরের বিপাকীয় কার্যকলাপ থেকে শুরু করে শক্তি উৎপাদন পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যখন এই হরমোনের মাত্রা সামান্য এদিক-ওদিক হয়, তখনই শরীরে দেখা দেয় নানা বিপত্তি। নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এই সমস্যা বাড়ছে; সমীক্ষা বলছে, প্রতি ১০০০ নারীর মধ্যে অন্তত ১৫ জন এবং ১০০০ পুরুষের মধ্যে ১ জন এই থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত। আজ বিশ্ব থাইরয়েড দিবসে, যার এই বছরের প্রতিপাদ্য ‘থাইরয়েড ও যোগাযোগ’, আসুন জেনে নিই কীভাবে জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তনেই এই নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
লক্ষণগুলো চিনুন: থাইরয়েড কি আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে?
থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হলে (হাইপোথাইরয়েডিজম) এবং বেশি উৎপন্ন হলে (হাইপারথাইরয়েডিজম) উভয় ক্ষেত্রেই শরীর ভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়। বিষণ্নতা, অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, তীব্র ক্লান্তি, শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, চুল পড়া, দুর্বল আলোর সংবেদনশীলতা, এবং শক্তির অভাব—এগুলো সবই থাইরয়েডের সাধারণ লক্ষণ। প্রাথমিক পর্যায়ে এই লক্ষণগুলো ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেও এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে যা করবেন: সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি
নিয়মিত পরীক্ষা: থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা জানতে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা অপরিহার্য। ঘরে বসেই একটি বেসাল থার্মোমিটার দিয়ে দৈনিক ১০ মিনিটের তাপমাত্রা মেপেও প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন।
পর্যাপ্ত জল পান: থাইরয়েড রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পাতিত জল পান করা অত্যন্ত জরুরি। পাতিত জলে ক্লোরিন, ফ্লোরাইড ও ব্রোমিনের মাত্রা কম থাকে, যা থাইরয়েড গ্রন্থিকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
সঠিক পুষ্টি: আপনার খাদ্যতালিকায় সেলেনিয়াম, টাইরোসিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। থাইরয়েড রোগীদের অবশ্যই ভিটামিন বি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত, যা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
পর্যাপ্ত ঘুম: দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী। পর্যাপ্ত বিশ্রাম শরীরকে সতেজ রাখে এবং হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে।
থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে যা করবেন না: এড়িয়ে চলুন এই অভ্যাসগুলো
ধূমপান ও অ্যালকোহল: এই দুটি নেশাই থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুস্থ থাকতে দ্রুত এগুলি ত্যাগ করুন।
ট্রান্স-ফ্যাট ও চিনি: চর্বি, অতিরিক্ত প্রোটিন, এবং চিনি ও ক্যাফেইন সমৃদ্ধ খাবার থাইরয়েড রোগীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অতিরিক্ত ক্যাফেইন পিটুইটারি গ্রন্থি দ্বারা উৎপাদিত টিএসএইচ এর মাত্রা পরিবর্তন করতে পারে, যা থাইরয়েডকে আরও প্রভাবিত করে।
কিছু সবজি থেকে সাবধান: ব্রোকোলি, বাঁধাকপি এবং ফুলকপির মতো কিছু সবজি থাইরয়েড রোগীদের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। অনেকেই ওজন কমাতে এই ধরনের শাক-সবজি ডায়েটে রাখলেও, থাইরয়েড থাকলে এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
প্যাকেটজাত ও প্রসেসড খাবার: এসব খাবারে লবণ, চিনি ও তেলের পরিমাণ বেশি থাকে, যা ওজন দ্রুত বাড়াতে পারে এবং থাইরয়েডের সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। যতটা সম্ভব তাজা ও প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ করুন।
অতিরিক্ত ফাইবার: ফাইবারজাতীয় খাবার শরীরের জন্য উপকারী হলেও, থাইরয়েড থাকলে অত্যাধিক ফাইবার গ্রহণ না করাই ভালো। আমেরিকান নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ২৫-৩৮ গ্রামের বেশি ফাইবার গ্রহণ করা উচিত নয়।
দুগ্ধজাত খাবার: বেশিরভাগ চিকিৎসকের মতে, দুগ্ধজাত খাবার শরীরে হরমোনের তারতম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই দুধ, মাখন, চিজের মতো খাবার এড়িয়ে যাওয়া ভালো।
আজ বিশ্ব থাইরয়েড দিবসে এই বার্তাটিই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, থাইরয়েড সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা এবং সতর্কতা মানুষকে এই নীরব রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। ‘থাইরয়েড ও যোগাযোগ’ এই প্রতিপাদ্যটিই যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, থাইরয়েড নিয়ে কথা বলা এবং সচেতন হওয়া কতটা জরুরি।