নিজের শরীরই যখন নিজের শত্রু! এই ৮টি সাধারণ লক্ষণ আদতে মারণ ‘অটোইমিউন’ রোগের সংকেত নয় তো?

আজকের দিনে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এমন এক রোগে আক্রান্ত, যা নিঃশব্দে শরীরের ভেতর বাসা বাঁধে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে একে চেনা প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘অটোইমিউন ডিজিজ’ (Autoimmune Disease)। সহজ ভাষায়, আমাদের শরীরের যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি আমাদের বাইরের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে, সে নিজেই যখন পথ হারিয়ে ভুলবশত শরীরের সুস্থ টিস্যু ও অঙ্গগুলোকে আক্রমণ করতে শুরু করে, তখনই এই রোগ হয়।

বেশিরভাগ মানুষই এর প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে খুব সাধারণ মনে করে এড়িয়ে যান। জেনে নিন অটোইমিউন রোগের এমন ৮টি সূক্ষ্ম লক্ষণ, যা অবহেলা করলে পরবর্তীতে বড় বিপদ হতে পারে:

১. একটানা ক্লান্তি (যা ঘুমোলেও কমে না)
পরিশ্রমের পর ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও যদি শরীর ম্যাজম্যাজ করে এবং বিছানা থেকে উঠতেই ইচ্ছে না করে, তবে তা চিন্তার বিষয়। এটি সাধারণ ক্লান্তি নয়; শরীরের অতি-সক্রিয় ইমিউন সিস্টেমের কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ প্রদাহের বিরুদ্ধে এটি শরীরের এক ধরণের লড়াইয়ের ক্লান্তি।

২. সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত-পা শক্ত হয়ে যাওয়া
অনেকেরই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হাত বা পায়ের গাঁট বা জয়েন্টগুলো শক্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে এই শক্ত ভাব যদি আধ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, তবে সতর্ক হন। ‘স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জার্নাল অফ রিউম্যাটোলজি’-র গবেষণা অনুযায়ী, এটি রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগের প্রধান লক্ষণ।

৩. মনোযোগের অভাব বা ‘ব্রেন ফগ’
অটোইমিউন রোগ সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে মানুষ গভীর মনোযোগ দিতে পারে না, ছোটখাটো জিনিস ভুলে যায় এবং মাথায় সবসময় একটা কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব বা ‘ব্রেন ফগ’ (Brain Fog) তৈরি হয়। অনেকে একে কাজের চাপ বা কম ঘুমের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যান, যা ঠিক নয়।

৪. অস্বাভাবিক চুল পড়া
হরমোনের তারতম্য বা পুষ্টির অভাবে চুল পড়তেই পারে। কিন্তু কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই যদি হঠাৎ মাথাভর্তি চুল পাতলা হতে শুরু করে, তবে তা লুপাস (Lupus) এবং হাশিমোটোস থাইরয়েডাইটিসের মতো অটোইমিউন থাইরয়েডের সমস্যা হতে পারে।

৫. চোখ ও মুখের দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা
চোখ ও মুখ শুকিয়ে যাওয়াকে অনেকেই জল কম খাওয়া বা অতিরিক্ত মোবাইল-ল্যাপটপ স্ক্রিন টাইমের ফল বলে মনে করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা ‘সিওগ্রেনস সিনড্রোম’ (Sjogren’s Syndrome) নামক অটোইমিউন রোগের লক্ষণ হতে পারে, যা শরীরের জল ও লালা নিঃসরণকারী গ্রন্থিগুলোকে নষ্ট করে দেয়।

৬. বারবার হালকা জ্বর আসা ও যাওয়া
কোনো রকম ইনফেকশন বা ঠান্ডা লাগা ছাড়াই যদি শরীর প্রায়ই হালকা গরম থাকে বা তাপমাত্রা ওঠানামা করে, তবে তা ইমিউন সিস্টেমের অনবরত সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত হতে পারে। একে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে ভুল করবেন না।

৭. ত্বকে প্রজাপতির মতো লালচে র‍্যাশ
ত্বকের যেকোনো অস্বাভাবিক বদলকে গুরুত্ব দিন। বিশেষ করে নাকের দু’পাশে এবং গালে যদি লালচে প্রজাপতির মতো আকৃতির (Butterfly Rash) কোনো দাগ বা র‍্যাশ দেখা যায়, তবে তা লুপাসের মতো জটিল রোগের বড় লক্ষণ হতে পারে।

৮. হাত-পা অবশ হওয়া ও পেশির দুর্বলতা
হাত, পা বা শরীরের কোনো অংশে হঠাৎ অবশ ভাব, সারাক্ষণ ঝিনঝিন করা কিংবা পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া কখনোই অবহেলা করবেন না। মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের (Multiple Sclerosis) মতো বিপজ্জনক অটোইমিউন রোগে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে এমন স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেয়।

সম্পাদকের কলমে: অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রে যত দ্রুত রোগ শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসা তত বেশি ফলপ্রসূ হয় এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। তাই আপনার শরীরে উপরোক্ত লক্ষণগুলোর মধ্যে একাধিক লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে দেখা দিলে, অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।