কাজের চেইপ কুঁজো হয়ে যাচ্ছে ৭০ শতাংশ অফিসকর্মী, শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি!

কাজের চাপে দিনের পর দিন ধরে কম্পিউটারের সামনে ঝুঁকে বসে থাকার কারণে কুঁজো হয়ে যাচ্ছেন বহু মানুষ। সরকারি পুষ্টি সংস্থা ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশনের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ অফিসকর্মী, যারা দিনের প্রায় ছয় ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে চেয়ারে বসে কাজ করেন, তাদের মেরুদণ্ড ক্রমশ নুয়ে পড়ছে। আর এর ফলস্বরূপ অস্থি চিকিৎসকদের চেম্বারে বাড়ছে এই সমস্ত রোগীদের ভিড়। চিকিৎসকরা এই নতুন সমস্যার নাম দিয়েছেন ‘পুওর পশ্চার সিনড্রোম’। এর প্রধান উপসর্গ হল কাঁধ ও পিঠে অসহ্য ব্যথা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘক্ষণ ধরে ভুল ভঙ্গিমায় চেয়ারে বসে কাজ করাই এই সমস্যার মূল কারণ। দিনের অনেকটা সময় অফিসের চেয়ারে কাটানো বহু মানুষ টের পান না, কিভাবে তাদের শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। যখন হুঁশ ফেরে, ততদিনে অনেকেরই মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক আকৃতি বদলে গিয়েছে।

রোগীদের কেস হিস্ট্রি খতিয়ে দেখে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সমস্যার উৎস লুকিয়ে রয়েছে অফিসের চেয়ারেই। বর্তমানে প্রায় সকল অফিসেই কম্পিউটারের ব্যবহার ব্যাপক। কাজ করার সময় সকলেই সামনের দিকে ঝুঁকে কম্পিউটারে টাইপ করেন। মেরুদণ্ডের একটি স্বাভাবিক বাঁক বা গঠন রয়েছে। কিন্তু একটানা ভুলভাবে চেয়ারে বসে কাজ করলে মেরুদণ্ডে অস্বাভাবিক চাপ পড়ে। এই চাপ থেকেই প্রথমে ব্যথার সূত্রপাত হয় এবং ধীরে ধীরে মেরুদণ্ড বেঁকে যেতে শুরু করে।

তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটানা দেড় ঘণ্টার বেশি চেয়ারে বসে কাজ করা উচিত নয়। এছাড়াও চেয়ারে বসার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা জরুরি। সেই নিয়মগুলি হল – চোখ থাকতে হবে কম্পিউটারের স্ক্রিনের সঙ্গে একই সরলরেখায়। কি-বোর্ড রাখতে হবে বুকের কাছাকাছি। এই সঠিক অবস্থানে বসেই মেরুদণ্ড সোজা রেখে কাজ করা সম্ভব।

তবে বাস্তবে বেশিরভাগ অফিসেই টেবিলের উপর যেমন তেমনভাবে কম্পিউটার রাখা থাকে এবং একটি সাধারণ চেয়ার ব্যবহার করা হয়। কম্পিউটার ও চেয়ারের উচ্চতা বা ‘লেভেল’ ঠিক করার কোনও ব্যবস্থা থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকেই নড়বড়ে এবং অস্বাস্থ্যকর চেয়ারে দিনের পর দিন কাজ করে যান। তাদের মতে, দাঁড়িয়ে থাকলেও মেরুদণ্ডে ততটা চাপ পড়ে না, যতটা পড়ে এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক চেয়ারে বসলে। ভুল বসার ভঙ্গি শরীরে রক্ত সঞ্চালনেও সমস্যা তৈরি করে। এই ভুল ভঙ্গি হিপ ফ্লেক্সর ও ইলিওপসাস পেশিতে চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়াও নিতম্বের বাটক মাসলও চাপের মধ্যে থাকে। এই পেশিগুলিই শিরদাঁড়াকে সোজা রাখতে সাহায্য করে। তাই অল্প বয়সেই মেরুদণ্ডের সমস্যা এবং কুঁজো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

চিকিৎসকরা বলছেন, স্পাইনাল লিগামেন্ট অনেকটা গার্ডারের মতো, যা একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। কিন্তু অফিসের অস্বাস্থ্যকর চেয়ারে দীর্ঘক্ষণ বসলে সেই লিগামেন্টের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তবে আশার কথা এই যে, শহরের অনেক অফিস ইতিমধ্যেই এই সমস্যার সমাধানে এরগোনোমিক চেয়ার কিনতে শুরু করেছে। যদিও অস্থি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চেয়ার যেমনই হোক না কেন, একটানা বসে থাকা কখনোই স্বাস্থ্যকর নয়। তাদের পরামর্শ, প্রতি দেড় থেকে দু’ঘণ্টা পর চেয়ার থেকে উঠে কিছুক্ষণ হেঁটে আসা উচিত।

পাশাপাশি, শরীরের আরামের জন্য নিয়মিত আকুপ্রেসার করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বাড়িতে একটি আকুপ্রেসার ফুটরোলার রাখার এবং প্রতিদিন সকালে ও রাতে পায়ের তলায় ঘষার কথা বলছেন তারা। এর মাধ্যমে কোমর, ঘাড় ও হাঁটুর ব্যথা উপশম হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বসে কাজ করলে শুধু মেরুদণ্ড নয়, শরীরের অন্যান্য অংশেও ক্ষয় হতে শুরু করে। তাই সচেতন থাকা এবং সঠিক নিয়ম মেনে চলাই এই সমস্যা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy