ইপার অ্যাসিডিটি, কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার – কেন এই ‘কমন সিমটম’ এতো গুরুত্বপূর্ণ?

আজকাল বহু মানুষ ‘ভীষণ রকম অ্যাসিডিটি’র সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন। সহজ কথায়, অতিরিক্ত অ্যাসিড ক্ষরণকেই হাইপার অ্যাসিডিটি বলা হয়, যা বর্তমান সময়ে একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা। আমাদের পাকস্থলী প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াই লিটার অ্যাসিড তৈরি করে, যার বেশিরভাগই খাবার হজমে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যখন এই অ্যাসিডের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, বা অ্যাসিডের প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, অথবা পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে (ইসোফেগাস) উঠে আসে, তখনই হাইপার অ্যাসিডিটির লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

অতিরিক্ত অ্যাসিড ক্ষরণের কারণ কী?
অ্যাসিড সাধারণত ‘প্যারাইটাল সেল’ থেকে নিঃসৃত হয় এবং ‘জি সেল’ নামক হরমোন (গ্যাস্ট্রিন) এটি নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং, অ্যাসিড বেশি ক্ষরণের পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে:

কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি: কারো যদি প্যারাইটাল সেল হাইপারপ্লাসিয়া (কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি) বা গ্যাস্ট্রিন জি সেল হাইপারপ্লাসিয়া হয়, তাহলে অ্যাসিডের ক্ষরণ বেশি হয়। এটি কিছু ক্ষেত্রে টিউমার, কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ খাওয়ার কারণে হতে পারে, এমনকি দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতীয়দের মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই এমনটা দেখা যায়।

বিরল রোগ: কিছু বিরল অসুখ, যেমন মিনেট্রির ডিজিজ, অ্যাসিড ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়।

খাদ্যাভ্যাস: তেল, ঝাল, মশলাযুক্ত খাবার, টক জাতীয় খাবার, ভাজাপোড়া, সরষে, বাদাম, নারকেল, চাটনি এবং কফির মতো উত্তেজক পানীয় খেলে আমাদের অ্যাসিড ক্ষরণ বাড়ে। এসব খাবার খাওয়ার পরেই রোগীরা প্রায়শই হাইপার অ্যাসিডিটির লক্ষণ অনুভব করেন।

খালি পেটে থাকা: অনেকক্ষণ খালি পেটে থাকলে অ্যাসিড পাকস্থলীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং অ্যাসিডিটির লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

কীভাবে অ্যাসিড ক্ষতি করে?
পাকস্থলীর একটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে, যা অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তাকে রক্ষা করে। মিউকোসা, মিউকাস লেয়ার এবং কিছু হরমোন অ্যাসিডকে সরাসরি স্নায়ুর সংস্পর্শে আসতে দেয় না। কিন্তু যখন কোনো কারণে আলসার, ইরোশন বা অন্য কোনো ক্ষত তৈরি হয়, তখন এই মিউকোসা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেতরের স্নায়ুগুলো অ্যাসিডের সংস্পর্শে চলে আসে। এর ফলে স্নায়ুগুলো অতি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং অ্যাসিডিটির লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

অস্বাভাবিক স্থানে অ্যাসিডের উপস্থিতি: রিফ্লাক্স ডিজিজ
কিছু ক্ষেত্রে অ্যাসিড তার স্বাভাবিক স্থান ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। রিফ্লাক্স ডিজিজ এর একটি উদাহরণ, যেখানে পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে (ইসোফেগাস) উঠে আসে। যেহেতু খাদ্যনালী অ্যাসিডে অভ্যস্ত নয়, তাই সেখানে অ্যাসিডের উপস্থিতি অস্বাভাবিক লক্ষণ প্রকাশ করে, যাকে হাইপার অ্যাসিডিটি বলে।

সাধারণ লক্ষণ ও কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
হাইপার অ্যাসিডিটির সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বুক জ্বালা, মুখের মধ্যে টক জল আসা, এবং ঢেকুর ওঠা। যদিও বুক জ্বালা বা বুকে ব্যথা হার্টের রোগের লক্ষণ বলে মনে হতে পারে, তবে অ্যাসিডিটি থেকে সরাসরি হার্টের রোগ হয় না।

যদি আপনার হাইপার অ্যাসিডিটির সমস্যা হয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। চিকিৎসক রোগীর খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, এবং কোনো ওষুধ সেবন করছেন কিনা—সব ইতিহাস জেনে কারণ নির্ণয় করার চেষ্টা করেন। ওষুধের কারণে কোনো রিফ্লাক্স হচ্ছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হয়।

চিকিৎসা ও সতর্কতা
অ্যাসিডিটির প্রাথমিক চিকিৎসায় অ্যান্টাসিড ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘকালীন অ্যাসিডিটির ক্ষেত্রে প্যান্টোপ্রাজল জাতীয় ওষুধ (PPI) খুব ভালো কাজ করে। তবে, এই ওষুধগুলো খেয়ে বেশিদিন উপসর্গ ধামাচাপা না দিয়ে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ঠিক কী কারণে হাইপার অ্যাসিডিটি হচ্ছে, তা জানা প্রয়োজন।

মনে রাখবেন, হাইপার অ্যাসিডিটির কারণে সরাসরি ক্যান্সারের মতো রোগ হয় না ঠিকই, তবে এটি আলসার সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে জটিলতা বাড়ায়। তাই এই বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।