বর্তমান যুগে স্মার্টফোন ছাড়া আমাদের একদিনও চলা দায়। কিন্তু এই প্রয়োজনীয় যন্ত্রটিই যখন নেশায় পরিণত হয়, তখন তা আমাদের শরীরের জন্য হিরোশিমার বোমার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন চিকিৎসা সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা দিনে ৫ ঘণ্টার বেশি মোবাইল ব্যবহার করেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক জটিলতার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে যে বিপদগুলো আপনার অজান্তেই দানা বাঁধছে:
১. ‘টেক্সট নেক’ এবং মেরুদণ্ডের সমস্যা
ঘন্টার পর ঘন্টা মাথা নিচু করে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে আমাদের ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘টেক্সট নেক’ (Text Neck) বলা হয়। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী ঘাড় ব্যথা, কাঁধের জড়তা এবং মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষয় হতে পারে।
২. চোখের রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি
মোবাইলের স্ক্রিন থেকে নির্গত ‘ব্লু লাইট’ বা নীল আলো চোখের রেটিনার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি চোখের কর্নিয়াকে শুকিয়ে ফেলে (Dry Eye Syndrome), যার ফলে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া এবং অসময়ে চোখের পাওয়ার বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৩. ঘুমের বারোটা বাজছে!
রাতের অন্ধকারে মোবাইল স্ক্রিনের আলো আমাদের মস্তিষ্কে ‘মেলাটোনিন’ (Melatonin) হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়। এই হরমোনটি আমাদের ঘুমাতে সাহায্য করে। ফলে অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের কারণ হতে পারে।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ও একাকীত্ব
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আমরা যত বেশি সময় কাটাই, বাস্তব জগত থেকে আমরা তত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। এটি মানুষের মধ্যে বিষণ্ণতা (Depression), উদ্বেগ (Anxiety) এবং হীনম্মন্যতা তৈরি করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার রিঅ্যাকশন দেখে নিজেদের বিচার করার এক বিপজ্জনক মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।
৫. মনোযোগের ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস
মোবাইলের অতিরিক্ত নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্কের একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়। গবেষণা বলছে, ঘনঘন ফোন চেক করার ফলে মানুষের সৃজনশীলতা কমে যায় এবং অল্পতেই ধৈর্য হারানোর প্রবণতা বাড়ে।
বাঁচার উপায় কী? (ডিজিটাল ডিটক্স)
২০-২০-২০ নিয়ম: প্রতি ২০ মিনিট ফোন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো জিনিসের দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন।
বিছানায় ফোন নয়: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে সরিয়ে রাখুন।
নোটিফিকেশন অফ: অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন যাতে বারবার ফোন হাতে নিতে না হয়।
উপসংহার: মোবাইল যেন আপনাকে ব্যবহার না করে, বরং আপনি মোবাইলকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করুন। প্রযুক্তির সুফল ভোগ করুন, কিন্তু তাকে আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রক হতে দেবেন না। সুস্থ থাকতে হলে স্ক্রিন টাইম কমিয়ে বাস্তবের মানুষের সাথে সময় কাটান।