বাঙালির হৃদয়ে আজও অম্লান মহানায়ক উত্তম কুমার। তাঁর প্রয়াণ দিবস, ২৪শে জুলাই, স্মরণে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত হল এক বিশেষ সম্মাননা অনুষ্ঠান। বাংলা চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য একাধিক গুণী শিল্পীকে ‘মহানায়ক’ সম্মান প্রদান করা হয়। এই বিশেষ দিনে উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, এবং তাঁদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
‘মহানায়ক’ সম্মানে ভূষিত তারকারা
এ বছর বাংলা ছবিতে সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘মহানায়ক শ্রেষ্ঠ সম্মান’ পেলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ। এছাড়াও ‘মহানায়ক সম্মান’-এ ভূষিত হয়েছেন টলিউডের জনপ্রিয় মেকআপ আর্টিস্ট তথা প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথ কুণ্ডু, সঙ্গীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তী ও রূপঙ্কর বাগচী, অভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরী, এবং প্রোডাকশন ডিজাইনার আনন্দ আঢ্য। এই সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হলো।
মুখ্যমন্ত্রীর নতুন ঘোষণা ও বাংলা সিনেমার গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক নতুন ঘোষণা করেন। তিনি জানান, বাংলার সঙ্গীত একাডেমি তৈরি হয়ে গেছে এবং খুব শীঘ্রই এর উদ্বোধন হবে। পাশাপাশি, এবছরের টেলি একাডেমি পুরস্কার অনুষ্ঠানও দ্রুত আয়োজিত হবে। ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের চেয়ারপার্সন পদে এবারও থাকছেন গৌতম ঘোষ। মুখ্যমন্ত্রী সকল দর্শক ও নির্মাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনারা সব সিনেমাকে গুরুত্ব দিন। কিন্তু দয়া করে বাংলা সিনেমাকে অবহেলা করবেন না। বাংলায় যারা গান গেয়েছেন সেই শিল্পীদের দয়া করে একটু বেশি গুরুত্ব দিন।” এই বার্তা বাংলা চলচ্চিত্র এবং সঙ্গীত শিল্পের প্রতি তাঁর বিশেষ গুরুত্বের প্রতিফলন।
প্রসেনজিতের ‘সিনেমা ঘর’ উদ্যোগের প্রশংসা
এদিন মুখ্যমন্ত্রী টলিউডের সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের এক অভিনব উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “প্রসেনজিৎ একটা ভাল আইডিয়া করেছে, একটা মডেল করেছে। অফিসাররা দেখে এসে আমায় জানিয়েছে। আমাদের ভাল লেগেছে মডেলটা।” মুখ্যমন্ত্রী জানান, “প্রায় ১০০টা জায়গায় ৪০-৫০ জন বসার মতো একটা সিনেমা ঘর তৈরি করছে (প্রসেনজিৎ)।” তাঁর মতে, এই মডেল বাস্তবায়িত হলে “বুথ স্তরে, তৃণমূল স্তরে, প্রত্যন্ত গ্রামে সিনেমাগুলি দেখতে পাবেন সকলে। সিনেমার চাহিদা বাড়বে ওরা যে সিনেমাগুলি তৈরি করে, তার মার্কেট পাবে। কর্মসংস্থান হবে।” এই উদ্যোগ বাংলা ছবির দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্পকে চাঙ্গা করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সিরিয়ালের বিষয়বস্তু নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা
বাংলা বিনোদন জগতের নিয়মিত দর্শক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন মেগা সিরিয়ালগুলির বিষয়বস্তু নিয়েও তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, কিছু ধারাবাহিক সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নির্মাতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “এখন দেখি সিরিয়ালগুলোতে শুধু এ ওকে বিষ দিচ্ছে। একটা পরিবারে তিনজন ঝগড়া করছে। বাজে বাজে জিনিসগুলো শেখাচ্ছে। এতে সমাজে বাচ্চারা ভুল করছে। অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। দয়া করে খারাপ কিছু শেখাতে যাবেন না।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “সিরিয়াল বাড়াতে হবে বলে রোজ গুণ্ডামি দেখানো হচ্ছে। কত ভাল জিনিস আছে। বাড়ান সে সব জিনিস দিয়ে।” তিনি মনে করেন, “সারাদিন আমরা এত কাজে কর্মে ব্যস্ত থাকি, আবার টেনশন করব? ওটা টেনশন নয়, রিল্যাক্সসেশনের জন্য। এটা তৈরি করতে হবে, এসব মাথায় রেখে।” সামাজিক, হাসি-খুশি এবং সংস্কৃতিকে ভালোবাসে এমন গল্প তৈরির পরামর্শ দেন তিনি, যা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে। সেই সঙ্গে সিরিয়ালে বাংলা গানকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই অনুষ্ঠানটি একদিকে যেমন শিল্পীদের সম্মাননা জানানোর মঞ্চ ছিল, তেমনই অন্যদিকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং তার সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে তাঁর স্পষ্ট বার্তা দিলেন।